শিবরাম চক্রবর্তীর গল্পে যেমন ব্যঙ্গের মোড়কে ‘দেবতার জন্ম’-এর ছবি ফুটে উঠেছিল, তেমনই শনিবার ইডেন গার্ডেন্সে যেন ভারতীয় ক্রিকেটে আর এক নতুন নক্ষত্রের আবির্ভাব দেখা গেল। সেই নাম বৈভব সূর্যবংশী। মাত্র পনেরো বছর বয়সেই যাঁকে ঘিরে উন্মাদনা এখন আকাশছোঁয়া। রাজস্থান রয়্যালসের অনুশীলনে বড় বড় তারকা উপস্থিত থাকলেও আলোটা পুরোপুরি কেড়ে নিল এই কিশোর ক্রিকেটারই।
মাঠে ছিলেন যশস্বী জয়সওয়াল, জোফ্রা আর্চারের মতো আন্তর্জাতিক তারকারা। কিন্তু গ্যালারিতে যারা এসেছিলেন, তাদের মুখে একটাই নাম—বৈভব। কেউ ডাকছেন অটোগ্রাফের জন্য, কেউ আবার মোবাইলে ছবি তুলতে চাইছেন। লাজুক মুখে সব আবদারই মেটাতে দেখা গেল তাঁকে। কখনও ব্যাট হাতে, কখনও আবার শিশুসম হাসিতে ভক্তদের সঙ্গে সেলফি তুলছেন তিনি।তবে মাঠের বাইরের এই শান্ত স্বভাবের ছেলেটি নেটে একেবারেই অন্য মানুষ। ব্যাট হাতে নামতেই শুরু হলো দাপট। একের পর এক বল উড়িয়ে মারছেন অনায়াসে। সামনে কে বোলিং করছেন, তা যেন তাঁর কাছে বড় কথা নয়। কিশোরসুলভ নির্ভীকতা আর স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রাসনেই তিনি নিজের ছাপ রেখে চলেছেন। যদিও অনুশীলনের মাঝে কয়েকবার আউটও হলেন, কিন্তু তাতে আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরার কোনও লক্ষণ নেই। বরং পরের বলেই আবার বড় শট খেলতে প্রস্তুত। আগের ম্যাচে হায়দরাবাদের এক তরুণ পেসারের প্রথম বলেই আউট হয়েছিলেন বৈভব। সেই ব্যর্থতার পর ইডেনের অনুশীলনে শর্ট বলের বিরুদ্ধে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে দেখা গেল তাঁকে। রাজস্থানের ব্যাটিং কোচ বিক্রম রাঠোরও এসে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন তাঁর সঙ্গে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রতিভাবান এই ছেলেকে ঘষেমেজে আরও ধারালো করে তুলতে চাইছে ফ্র্যাঞ্চাইজি। তবে রাজস্থান রয়্যালস শুধু ক্রিকেটার বৈভবকে নয়, মানুষ বৈভবকেও যত্নে আগলে রাখতে চাইছে। বয়ঃসন্ধির এই সময়ে হঠাৎ জনপ্রিয়তা সামলানো সহজ নয়। তাই অনুশীলন জুড়েই তাঁর পাশে দেখা গেল দলের কোনও না কোনও আধিকারিককে। ভক্তদের মাঝে যাওয়া হোক কিংবা ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো—সব সময় নজরে রাখা হচ্ছে বৈভবকে। মাঠের বাইরের চাপ যাতে তাঁর খেলায় প্রভাব না ফেলে, সে দিকেও বিশেষ সতর্ক দল।
সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য ছিল ছোট ছোট সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার। যে বয়সে অনেকেই বাবা-মায়ের হাত ধরে ইডেনে খেলা দেখতে আসে, সেই বয়সেই বৈভব নিজেই এখন আকর্ষণের কেন্দ্র। এক খুদে সমর্থককে নিজের কিট উপহার দিতেও দেখা গেল তাঁকে। এই সরল আচরণই যেন তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলছে। ইডেন গার্ডেন্স বহু কিংবদন্তিকে দেখেছে—সুনীল গাভাসকর, সচিন তেন্ডুলকর, মহেন্দ্র সিং ধোনি, বিরাট কোহলির মতো তারকারা এই মাঠ মাতিয়েছেন। কিন্তু এত অল্প বয়সে কোনও ক্রিকেটারকে ঘিরে এমন উন্মাদনা খুব কমই দেখা গেছে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের খারাপ পারফরম্যান্সে যেখানে গ্যালারি পুরোপুরি ভরছে না, সেখানে রবিবারের ম্যাচে বৈভবকে দেখার টানেই টিকিটের চাহিদা বেড়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—রবিবার ম্যাচে কি তিনি সেই আলো মাঠেও ছড়াতে পারবেন? সুনীল নারিন, ক্যামেরন গ্রিনদের মতো অভিজ্ঞ বোলারদের বিরুদ্ধে কি আবার ঝড় তুলবেন? উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। তবে শনিবার ইডেন যা দেখল, তাতে এটা নিশ্চিত—ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন এক তারকার জন্মের ইঙ্গিত মিলেছে। এদিকে জানিয়ে রাখা ভালো শনিবার কেকেআর কোনো রকম প্র্যাকটিস করেনি কারণ এটা ওদের ট্র্যাভেল ডে ছিল ।

