বাংলায় পরিবর্তনের প্রবল হাওয়া : ১৯২ আসনে এগিয়ে বিজেপি, ম্যাজিক ফিগার পেরিয়ে নীলবাড়ি দখলের পথে গেরুয়া শিবির

কলকাতা : ২০২৬-এর বঙ্গ নির্বাচনে প্রথমবার ফুটতে চলেছে পদ্ম । সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া ভোট গণনার প্রাথমিক প্রবণতায় অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। বেলা ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে অনেকটা পিছনে ফেলে নির্ণায়ক ব্যবধানে এগিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনের প্রবণতা এখন সামনে। এর মধ্যে বিজেপি এককভাবে ১৯২টি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যা সরকার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮-এর ম্যাজিক ফিগার থেকে অনেক বেশি। অন্যদিকে, বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে মাত্র ৯৫টি আসনে।

বাকি আসনগুলোর মধ্যে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এইউপি) ২টি, আইএসএফ ১টি, কংগ্রেস ১টি এবং সিপিআই(এম) ১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এই ফল বজায় থাকলে বাংলায় গত এক দশকের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে নবান্নে ক্ষমতাসীন হতে চলেছে বিজেপি।

কলকাতার হাইপ্রোফাইল কেন্দ্র ভবানীপুরে প্রথম কয়েক রাউন্ডে পিছিয়ে থাকার পর ঘুরে দাঁড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর চেয়ে ১৫,৪৯৪ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও, তাঁর মন্ত্রিসভার একাধিক হেভিওয়েট সদস্য বর্তমানে পিছিয়ে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন ব্রাত্য বসু, মলয় ঘটক, শশী পাঁজা, উদয়ন গুহ, পরেশ চন্দ্র অধিকারী, সুজিত বসু এবং বীরবাহা হাঁসদা। এছাড়াও পিছিয়ে রয়েছেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইন্দ্রনীল সেনের মতো প্রার্থীরা। অন্যদিকে, কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী এবং উত্তর মালদার মৌসম বেনজির নুরও পিছিয়ে রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।

বিপরীতে বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে লিড ধরে রেখেছেন। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, দিলীপ ঘোষ, স্বপন দাশগুপ্ত, অর্জুন সিং এবং তাপস রায় নিজ নিজ কেন্দ্রে এগিয়ে। বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন সন্দেশখালি আন্দোলনের মুখ রেখা পাত্র এবং আর জি কর কাণ্ডের নির্যাতিতার মা, তাঁরাও এই মুহূর্তে জয়ের পথে। শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম আসনে এবং আইএসএফ প্রধান নওশাদ সিদ্দিকী ভাঙড়ে এগিয়ে রয়েছেন।

পশ্চিম বর্ধমানের শিল্পাঞ্চল আসানসোল এবং দুর্গাপুরের ৯টি আসনেই বিজেপি প্রার্থীরা একাধিপত্য বজায় রেখেছেন। রানিগঞ্জে পার্থ ঘোষ ১৫,৯১২ ভোটে এবং আসানসোল দক্ষিণে অগ্নিমিত্র পাল ১৮,৮১২ ভোটে এগিয়ে। দুর্গাপুর পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় আসনেই পদ্ম শিবিরের জয় প্রায় নিশ্চিত।

একই চিত্র ধরা পড়ছে জঙ্গলমহলেও। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এবং ঝাড়গ্রামের বেশিরভাগ আসনেই বিজেপি এগিয়ে। ঝাড়গ্রামে লক্ষ্মীকান্ত সাও এবং মেদিনীপুর সদর আসনে শঙ্কর গুচ্ছাইত বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। খড়্গপুর সদরে দিলীপ ঘোষ জয়ের পথে। এই অঞ্চলে আদিবাসী ভোট ব্যাংক তৃণমূলের হাত থেকে সম্পূর্ণভাবে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে বলে মনে করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের মালদা, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারেও গেরুয়া ঝড় অব্যাহত।

বিপর্যয়কর ট্রেন্ড সামনে আসতেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তাঁর কর্মীদের শান্ত থাকার ও ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি সমস্ত কাউন্টিং এজেন্ট ও প্রার্থীদের অনুরোধ করছি, কোনো অবস্থাতেই গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বেরোবেন না। শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।” তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ তুলে দাবি করেন, যে সব জায়গায় তৃণমূল এগিয়ে আছে, সেখানে পরিকল্পিতভাবে গণনা ধীরগতিতে করা হচ্ছে বা তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। তিনি নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

গণনার ফল স্পষ্ট হতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অশান্তির খবর আসছে। আসানসোলের জামুড়িয়া বিধানসভার চুরুলিয়া গ্রামে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আসানসোল ও বীজপুরে তৃণমূল নেতা-কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর। নোয়াপাড়াতেও তৃণমূল প্রার্থীর ওপর হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে।

এই পরিস্থিতিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। অশান্তি রুখতে এবং ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাসভবনের সামনে বিশাল আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুট মার্চ চলছে। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনোভাবেই বিজয় মিছিল করা যাবে না এবং অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক ও পুলিশ কমিশনারদের ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বেলা আড়াইটার প্রবণতা অনুযায়ী, বাংলায় এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। জঙ্গলমহল থেকে উত্তরবঙ্গ, শিল্পাঞ্চল থেকে শহরাঞ্চল—সর্বত্রই পদ্ম শিবিরের জয়জয়কার। যদিও বিকেলের দিকে চূড়ান্ত ফলাফল আসার আগে তৃণমূল কোনোভাবেই হাল ছাড়তে নারাজ, তবে বর্তমান ব্যবধান ঘোচানো একপ্রকার অসম্ভব বলেই মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল। সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে আজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + 17 =