নতুন শিল্প নিয়ে তোড়জোড় শুরু রাজ্যে অথচ বন্ধ জুটমিল শ্রমিকদের জীবন তলিয়ে যাচ্ছে অমাবস্যার গহন অন্ধকারে

রাজীব মুখোপাধ্যায়, হাওড়া

রাজ্যে বুধবার সমাপ্ত হয়েছে বিশ্ব বাংলা বাণিজ্য সম্মেলন। তাতে রাজ্য সরকারের দাবি, মাত্র ২ দিনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে রাজ্য সরকার। ৩ লক্ষ ৪২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। গত পাঁচ বছরে ১২ লক্ষ কোটির বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল। এবার তার চার ভাগের এক ভাগ নিয়োগ প্রস্তাবে খুশি রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে এবারের বিশ্ব বঙ্গ সম্মেলনে বিভিন্ন দপ্তর মিলে ১৩৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা, পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য ক্ষেত্র এবং রয়েছে পর্যটন। তিন লক্ষ কোটি টাকার উপরে বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ৪০ লক্ষ ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ বছরের শিল্প সম্মেলন এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে সফল সম্মেলনের একটি।

তবে রাজ্য সরকারের এই দাবির পাশে রয়েছে এই রাজ্যে আঁধারে ডুবে যাওয়া চট শিল্পের ভবিষ্যৎ। স্বাধীনতার আগে থেকেই গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল চট কারখানা। যার অর্ধেক এখন বন্ধ। কিছু চলে গিয়েছে প্রমোটার চক্রের হাতে। আর হাতে গোনা যে কয়েকটি চালু আছে সেগুলো ধুঁকছে। অন্যান্য জেলার মতোই হাওড়াতে চট শিল্পের কারখানাগুলো বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে আর কয়েক মাস চালু থাকছে। এভাবেই অনিশ্চিত জীবন নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজার হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারে আসার আগে বলেছিলেন, যে সমস্ত কল কারখানা বন্ধ হয়ে আছে রাজ্যে, সেগুলোকে ফের চালু করার ব্যাবস্থা তিনি করবেন। আশার আলোতে বুক বেঁধেছিল চটকল শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিক। তবে যতদিন এগিয়েছে সেই আলো ক্রমেই অস্তমিত হয়ে গিয়েছে।

শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে অমাবস্যার নিকষ কালো আঁধার। হাওড়া জেলার নিশ্চিন্দা থেকে শুরু করে উলুবেড়িয়া অব্দি বহু চটকল আজ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। যাদের মধ্যে হাওড়া, মহাদেব, ডেল্টা, ন্যাশনাল চটকল সবারই একই চিত্র। গেটে তালা পড়েছে। কবে খুলবে তার উত্তর নেই কারোর কাছেই। ডেল্টা জুটমিলে কর্মরত এক শ্রমিক রবিন চৌধুরী বলেন, ডেল্টা জুটমিলের ভেতরে আরো দুটি জুটমিল রয়েছে। দুটোই বন্ধ হয়ে আছে। পাশাপাশি বন্ধ এশিয়ার অন্যতম ন্যাশনাল জুট মিল। রাজ্য সরকারের কোনো সদিচ্ছা নেই এই জুটমিলগুলোকে পুনরায় চালু করার। শ্রমিকেরা বহু আত্মত্যাগ করে এই জুটমিলগুলো চালু করেছিল। তবে মালিক পক্ষের থেকেও কোনো সমর্থক বার্তা নেই। মিলের আরেক শ্রমিক ওম প্রকাশ সিং জানান, সরকার ছোট শিল্প আনার কথা বলছে। আর এখানে একজন শ্রমিক পিছু তিন চার জন রয়েছে। তাই এখানে নজর দিলে অনেক উন্নতি হত। তবে সরকারের কোনো ইচ্ছা নেই, তা না হলে এরকম হাল হতো না মিলের। শ্রমিক পরিবারের সদস্যা হেমন্তী সাউ ও কাজল চৌধুরী স্পষ্ট বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলই ভালো নয়। যদি হতো তাহলে কারখানার এই হাল হতো না।

সরকারের থেকে কিছু চাল ডাল পাওয়া যাচ্ছে। নাহলে উনুনে হাঁড়িও চাপতো না বলেই দাবি করেন তারা। তারা হতাশা চাপা না দিয়ে বলেন, এর চেয়ে ভালো মিল বন্ধ করে দিক। বারবার তাদের ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে। কোনোমতে সংসারটা চলছে বলেই দাবি করেন তারা। তারা দ্বার্থহীন ভাষাতে বলেন, তারা যেভাবে দিন কাটাচ্ছেন তার চেয়ে রাস্তার ভিখারী অথবা রিক্সা চালকেরা ভালো অবস্থায় আছে। কর্মক্ষম লোকেরা কাজ পাচ্ছে না বলে তারা অভিযোগ করেন। হাওড়ার শিল্প অবনতির কথা স্বীকার করে নিয়ে হাওড়া মহিলা আইএনটিইউসির সভানেত্রী শ্রাবন্তী সিং বলেন, ষষ্ঠ বাণিজ্য সম্মেলন হচ্ছে তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন তিনি। তবে হাওড়ার ক্ষেত্রে নতুন শিল্প করার থেকে যে শিল্পগুলো ইতিমধ্যেই রয়েছে এবং ধুঁকছে সেই শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করুক সরকার। এগুলো পুনরুজ্জীবিত হলে প্রচুর সংখ্যায় কর্মসংস্থান হবে। এতে সিন্ডিকেট রাজ বন্ধ হবে বলে আশা করেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা খোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেই প্রতিশ্রুতি পালন করার জন্য তার প্রতি আবেদন জানান তিনি। রাজ্য সরকারের থেকে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী শেষ ১০ বছরে নতুন করে প্রায় ২৫ হাজার ছোট বড় শিল্প কারখানা বন্ধ হয়েছে রাজ্যে। ছ’টি শিল্প সম্মেলন করেও সেভাবে রাজ্যের অর্থনৈতিক ও শিল্পের বিকাশ ঘটেনি, তেমন বিশাল বিনিয়োগ হয়নি রাজ্যে, বারংবার অভিযোগ করে আসছে বিরোধী দলগুলো। তাহলে নতুন শিল্প না এলে রাজ্য সরকার কি পুরানো বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প নিয়ে মনোনিবেশ করবে সেই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যত বলতে পারবে। তবে এভাবে ধুঁকতে থাকা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবন যে দুর্বিষহ অমাবস্যার গহন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। নিজেদের দুর্দশা আদৌ কোনোদিন কাটবে কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা এই শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + nineteen =