রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই ক্রীড়া পরিকাঠামো এবং খেলাধুলার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নতুন প্রকল্প চালু করা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা আয়োজনের মতো একাধিক উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। এবার সেই ধারাবাহিকতায় বাংলার ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হলেন অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) সভাপতি কল্যাণ চৌবে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ। এই বৈঠকে শুধু আসন্ন ভারত-ব্রাজিল আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ নিয়েই নয়, বাংলার ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রূপরেখা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে মূল লক্ষ্য ছিল আগামী কয়েক বছরে বাংলার ফুটবলের ভিত আরও শক্ত করা। কল্যাণ চৌবে স্পষ্ট জানিয়েছেন, গত এক দশক বা তারও বেশি সময়ে বাংলার ফুটবল প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারেনি। একসময় দেশের ফুটবলের অন্যতম শক্তিকেন্দ্র হলেও বর্তমানে সেই অবস্থান অনেকটাই হারিয়েছে বাংলা। তাঁর মতে, শুধুমাত্র বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেই হবে না, বরং তৃণমূল স্তর থেকে খেলোয়াড় তৈরির জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, উন্নত কোচিং ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এখন থেকেই পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করা গেলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বাংলা আবার দেশের অন্যতম ফুটবল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীও আশ্বাস দিয়েছেন যে, ফুটবলের উন্নয়নে রাজ্য সরকার সর্বতোভাবে সহযোগিতা করবে। ফেডারেশনের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য ক্রীড়ামন্ত্রীকে বিশেষভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে কোনও প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক সমস্যা দেখা দিলে কেন্দ্র সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করে তার সমাধান করার আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারের লক্ষ্য, বাংলায় এমন একটি ফুটবল পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে এখানকার প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যতে নিয়মিত ভারতের জাতীয় দলে সুযোগ পাবে।
এই বৈঠকের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আগামী ৩ অক্টোবর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত হতে চলা ভারত ও ব্রাজিলের আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে ভারতের খেলা দেশের ফুটবল ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বর্তমানে ফিফা বিশ্বর্যাঙ্কিংয়ে ব্রাজিল শীর্ষস্থানীয় দলগুলির মধ্যে রয়েছে এবং ভারতের বিরুদ্ধে এত উচ্চ র্যাঙ্কিংয়ের প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার নজির আগে নেই। ফলে এই ম্যাচ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
জানা গিয়েছে, ম্যাচটি প্রীতি হলেও ব্রাজিল তাদের প্রথম সারির ফুটবলারদের নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে। যদিও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ায় নেইমারের মাঠে নামার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে ভারতীয় সমর্থকদের বড় আশা, দেশের কিংবদন্তি ফুটবলার সুনীল ছেত্রীকে যেন এই ম্যাচে দেখা যায়। তাঁকে মাঠে নামানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মহলে চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।
সরকার চাইছে, এই ম্যাচের আয়োজন আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই সম্পন্ন হোক। দর্শকদের নিরাপত্তা, টিকিট ব্যবস্থা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, স্টেডিয়ামের অবকাঠামো এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রস্তুতির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৈঠকের পর এআইএফএফ সভাপতি জানিয়েছেন, তিনি নিজে স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে সমস্ত প্রস্তুতি খতিয়ে দেখবেন। মঙ্গলবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন ঘুরে দেখে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেবেন তিনি।
এই ম্যাচকে ঘিরে অতীতের একটি বিতর্ক থেকেও শিক্ষা নিতে চাইছে সরকার। কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক তারকা লিওনেল মেসিকে ঘিরে যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার আগেভাগেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার এবং ফেডারেশন উভয়েই চাইছে, দর্শকরা যেন কোনও ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন না হন এবং আন্তর্জাতিক মানের একটি সফল ফুটবল উৎসবের সাক্ষী থাকতে পারেন।

