দুর্গাপুর : নতুন কায়দায় শুরু হয়েছে অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতারনার ছক। দেওয়া হচ্ছে না ওটিপি। ধরা হচ্ছে না অবাঞ্ছিত ফোন। তবুও অ্যাকাউন্ট থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। নতুন কায়দায় এই সাইবার প্রতারনায় ঘুম উড়েছে আম জনতার। দেশজুড়ে ক্রমশ ছড়াচ্ছে এই প্রতারণার জাল। বিভিন্ন মানুষকে টার্গেট করে পাতা হচ্ছে প্রতারণার জাল। সেই জালে জড়িয়ে সর্বস্ব হারাতে হচ্ছে জন সাধারণকে। আর সেই তদন্তে নেমে বড়সড় কেলেঙ্কারির পর্দাফাস করল আসানসোল দুর্গাপুর কমিশনারেট পুলিশ।
মঙ্গলবার পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের নাম গণেশ সর্দার, সচিন দাস, জিতেন্দ্র কুমার দাস এবং সুরেন্দ্র দাস। ধৃত চার যুবকই ঝাড়খণ্ডের দেওঘর জেলার মধুপুর এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একাধিক সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ল্যাপটপ, একাধিক মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি।
মঙ্গলবার ধৃতদের দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক ৮ দিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দেন।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, হোটেলে বসেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষকে ফোন বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে টার্গেট করে প্রতারণার জাল বিস্তার করত অভিযুক্তরা। বিভিন্ন কৌশলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে তাঁদের কাছ থেকে কষ্টার্জিত টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল এই চক্রের মূল লক্ষ্য বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। শুধু তাই নয়, ধৃতদের জেরা করে ইতিমধ্যে একাধিক তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। জানা গেছে, ধৃতরা একই হোটেলে থাকতেন না। পুলিশের নজর এড়িয়ে বিভিন্ন হোটেলে তাঁরা গা ঢাকা দিয়ে প্রতারণার ছক কষত। ফলে তাদের গতিবিধি সম্পর্কে সহজে আঁচ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের কাছে পৌঁছে যায় চারজনের অবস্থানের খবর। এরপরই দুর্গাপুর স্টেশন বাজারের সাধুডাঙা এলাকার ওই হোটেলে অভিযান চালায় দুর্গাপুর কোকওভেন থানার পুলিশ। তল্লাশি চালিয়ে চার যুবককে গ্রেফতার করা হয়। এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের প্রতারণার জাল কতদূর বিস্তৃত এবং কীভাবে তারা সাধারণ মানুষকে টার্গেট করত তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। উদ্ধার হওয়া ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন-সহ অন্যান্য সামগ্রীও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, দুদিন আগে দুর্গাপুর বিধাননগরের ব্যবসায়ী প্রবুদ্ধ গুহ-র অ্যাকাউন্ট থেকে ৬ লক্ষ টাকা গায়ে হয়ে যায়। তিনি দাবি করে বলেন,” সোমবার মোবাইলে পরপর কয়েকটি ফোন আসে। নম্বরগুলি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কোনওটিরই উত্তর দিই নি। বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হয়ে দ্রুত ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।”
অভিযোগ, ব্যাংকে জানানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই মোবাইলে আসে টাকা কেটে নেওয়ার বার্তা। সেখানে দেখা যায়, তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে ৬ লক্ষ টাকা ডেবিট হয়েছে। পরিবারের দাবি, “চিকিৎসার খরচ এবং ছেলের ভর্তি বাবদ ব্যবহারের জন্য ওই টাকা সঞ্চয় করে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ সেই অর্থ চলে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছি।” এরকমই আরও একটি ঘটনায় টাকা খুইয়েছেন কাঁকসা থানার অন্তর্গত পানাগড় গ্রামের বাসিন্দা প্রদীপ কুমার দে। তাঁর অভিযোগ, চলতি মাসের ১ তারিখ হঠাৎ তাঁর মোবাইলে পরপর একাধিক মেসেজ আসতে শুরু করে। মেসেজ খুলতেই চোখ কপালে ওঠে তাঁর। দেখা যায়, তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে মোট ৮ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ধাপে ধাপে কেটে নেওয়া হয়েছে। দুর্গাপুর সিটি সেন্টারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের গ্রাহক প্রদীপবাবু। তাঁর দাবি, তিনি কাউকে ওটিপি দেননি, কোনও অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত তথ্যও শেয়ার করেননি। তাহলে কীভাবে অ্যাকাউন্ট থেকে এত বিপুল টাকা গায়েব হল, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার (পূর্ব) রাসপ্রিত সিং বলেন, “ ধৃত চারজনই ঝাড়খণ্ডের দেওঘরের বাসিন্দা। এই হোটেল থেকেই প্রতারণার কাজ চলত। বিভিন্ন হোটেলে আমাদের অভিযান চলছে। সেই অভিযানের সময়ই এই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতদের পুলিশি হেফাজত চেয়ে তদন্ত চালানো হবে।”
প্রশ্ন, তাহলে কি দুর্গাপুরেকে সফট টার্গেট করে চলছে হোটেলকেন্দ্রিক এই ধরনের প্রতারণা চক্র? উল্লেখ্য, গত ২০২৪ সালে দুর্গাপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র সিটিসেন্টারে বুকে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সাইবার প্রতারণা চক্র চালানোর খবর পায় পুলিশ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ওই বছর ৪ সেপ্টেম্বর অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের ১৩ জনকে গ্রেফতার করে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার বিভাগের পুলিশ। ধৃতদের কাছে উদ্ধার হয় ১২ ল্যাপটপ, ১৩ টি মোবাইল, ও ৫ হেডফোন। ওই বছরই
গত ১১ আগষ্ট লাউদোহা থানার ইছাপুরে জামতাড়া গ্যাংয়ের পান্ডা সুরজ দাস ও বিকাশ, আকাশ নামে তিনজনকে পাকড়াও করে ঝাড়গ্রাম সাইবার পুলিশ। ধৃতদের কাছ থেকে ২ টি ট্যাব, ১২৩ টি মোবাইল সীমকার্ড, ১২ টি মোবাইল, ১৬ টি এটিএম কার্ড উদ্ধার হয়। তার আগে ওই বছরই জুলাই মাসে অন্ডাল থানার উখড়া গ্রামের সারদাপল্লীর বাসিন্দা সুরেশ মন্ডলের বাড়ি থেকে ‘জামতাড়া গ্যাং’ এর তিন দুষ্কৃতিকে গ্রেফতার করে আসানসোল সাইবার ক্রাইম থানার পুলিশ। ধৃত মণিষ মন্ডল, সন্তোষ মন্ডল জামতাড়া ও অমর মন্ডল দেওঘরের বাসিন্দা। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ১৭ টি স্মার্টফোন, দুটি ডেবিট কার্ড ও তিনটি মোবাইল ফোনের সিম। গত ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জামডাড়া গ্যাংয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টে’ খোকন দান ও মিঠুন দান সহ ৮ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ কমিশনারেটের সাইবার বিভাগ। যদিও এদিন পুলিশ জানিয়েছে,” ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রতারণা চক্রের নেটওয়ার্ক, তাদের সম্ভাব্য সহযোগী এবং প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া টাকার লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত চলছে।”

