মোহনবাগান: ১ (জেলকোভিচ) ইস্টবেঙ্গল: ০
নিজস্ব প্রতিবেদন: ফুটবলপ্রেমী বাঙালির কাছে ডার্বি মানেই এক আলাদা আবেগ। ব্রাজিল বা উরুগুয়ের ফুটবল উন্মাদনার আবহেও ঘরের মাঠে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের দ্বৈরথ যেন সব আনন্দকে ছাপিয়ে যায়। চলতি মরশুমের পরিসংখ্যান বলছিল, দুই প্রধানের লড়াই ছিল সমানে-সমানে। কলকাতা লিগে ম্যাচ ড্র হওয়ার পর, ডুরান্ড কাপে দু’দলই জিতেছিল একটি করে ম্যাচ। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের বিচারে অনেকেই ইস্টবেঙ্গলকে কিছুটা এগিয়ে রাখলেও, ডার্বির রং যে সবুজ-মেরুনই হতে চলেছে তা আবারও প্রমাণ করল বাগান ব্রিগেড। ইস্টবেঙ্গলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ২২ বারের জন্য আইএফএ শিল্ড ঘরে তুলল মোহনবাগান। সেই সঙ্গে ১৯৭৬ সালের পর, অর্থাৎ দীর্ঘ ৫০ বছর পর একই মরশুমে কলকাতা লিগ ও আইএফএ শিল্ড জয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড ফেরাল তারা। নতুন কোচ পানোসের হাত ধরে মরশুমের প্রথম ট্রফি এল সবুজ-মেরুন তাঁবুতে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে তীব্র আগ্রাসী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। খেলার মাত্র ৬ মিনিটেই গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। রামিরেজের পাস থেকে বল ধরে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন এডমুন্ড। কিন্তু তাঁর নেওয়া ডান পায়ের শটটি দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন বাগান গোলরক্ষক বিশাল কাইথ। এর ঠিক পরেই, ১৫ মিনিটে পালটা আক্রমণ শানায় মোহনবাগান। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ইস্টবেঙ্গলের দুই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে বক্সে ঢোকেন লি এরউইন। তবে তাঁর শটে জোরালো গতি না থাকায় সহজেই তা লুফে নেন ফুরবা লাচেনপা।
খেলার ৩৬ মিনিটে ফের দূরপাল্লার শটে গোল করার চেষ্টা করে সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। রশিদের ভুল পাস থেকে বল পেয়ে ছাংতের দিকে বাড়ান জেলকোভিচ। মাঝমাঠের কাছ থেকে ছাংতের নেওয়া সেই জোরালো দূরপাল্লার শটটি অসাধারণ দক্ষতায় বিপদমুক্ত করেন লাল-হলুদ গোলকিপার লাচেনপা। এক মিনিট পরেই ফের ইস্টবেঙ্গলের পরীক্ষা নেন সাহাল আব্দুল সামাদ। বক্সের ডান দিক থেকে তাঁর নেওয়া নিচু হাফ-ভলিটি বাঁ দিকের পোস্টের পাশ দিয়ে জালে ঢোকার মুহূর্তে চমৎকার ডাইভ দিয়ে বাঁচিয়ে দেন লাচেনপা।
তবে প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে এসে রক্ষণভাগের ভুলের খেসারত দিতে হয় ইস্টবেঙ্গলকে। প্রথম একাদশে আনোয়ার আলি না থাকায় এমনিতেই লাল-হলুদ ডিফেন্স নড়বড়ে দেখাচ্ছিল। ৪৫ মিনিটে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল করে মোহনবাগানকে এগিয়ে দেন জেলকোভিচ। বক্সের ঠিক বাইরে ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্সের মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে সাহাল চিপ করে বল বাড়িয়েছিলেন। ঠান্ডা মাথায় বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার এই ফুটবলার বল জড়িয়ে দেন ইস্টবেঙ্গলের জালে। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় মোহনবাগান। দ্বিতীয়ার্ধেও কিন্তু ইস্টবেঙ্গল কোচ আন্তোনিয়ো লোপেজ হাবাস আনোয়ার আলিকে মাঠে নামাননি।
দ্বিতীয়ার্ধে গোল শোধের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে ইস্টবেঙ্গল, তবে বাগান রক্ষণ ভাঙা সম্ভব হয়নি। ৪৮ মিনিটে বলের দখল নিতে গিয়ে লাচেনপার সঙ্গে সংঘর্ষ হয় সাহালের। ৫৫ মিনিটে রামিরেজের পাস থেকে বক্সে ঢুকেও সুযোগ নষ্ট করেন এডমুন্ড। ৫৮ মিনিটে হাবাস মাঠে নামান পিভি বিষ্ণু ও আকে লোবাকে। অন্যদিকে ৬৬ মিনিটে সাহালের জায়গায় মনবীরকে আনেন বাগান কোচ পানোস। এর মাঝেই সন্দীপ মান্ডির সঙ্গে সংঘর্ষে মাথা ফাটে দ্রাজিচের। তবে মাথা ফেটে রক্ত বেরোলেও লড়াকু মানসিকতা নিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেই মাঠে থেকে যান তিনি। তাঁর এই শরীরী ভাষা এবং ফেয়ার ট্যাকল গ্যালারির দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
খেলার ৬৭ মিনিটে পোলিশ স্ট্রাইকার জিওলিনস্কির একটি দুর্দান্ত হেড নিশ্চিত গোলের হাত থেকে বাঁচান বিশাল কাইথ। পরের মিনিটেই ছাংতের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৭০ মিনিটে লি এরউইন ও ছাংতের জায়গায় মনবীর ও অনিরুদ্ধ থাপাকে মাঠে নামান পানোস। ৭১ মিনিটে এডমুন্ডকে তুলে ডেভিডকে নামান হাবাস। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে ইস্টবেঙ্গলের খেলায় গোলের সেই তাগিদ বা ছন্দ দেখা যায়নি। ফ্রিকিক পেলেও রশিদের শট সবুজ-মেরুন মানবপ্রাচীরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। লোবা বারবার বল হারান এবং জিওলিনস্কির হেড ছাড়া লাল-হলুদ শিবির আর কোনও উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ক্লান্ত ও ছন্দহীন ফুটবল উপহার দিয়ে ম্যাচ শেষ করে লাল-হলুদ।
ফলে, ২০২৫ সালের পর ২০২৬ সালের আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিজেদের করে নিল মোহনবাগান। ডুরান্ড কাপ হারের মধুর প্রতিশোধ আইএফএ শিল্ডে নিয়ে উৎসবে মাতল গোটা সবুজ-মেরুন শিবির। জয়ের পর পড়শী ক্লাবকে খোঁচা দিয়ে বাগান সভাপতি দেবাশিস দত্ত বলেন, “কোনও এক ক্লাবের শীর্ষকর্তা বারবার বলেন জিততে গেলে মস্তানি করতে হয়। আজ মোহনবাগান মাঠে মস্তানি করেই জিতেছে। আইএসএল শুরু হলে দল আরও ফর্মে ফিরবে এই আশাই রাখি।”

