‘মন কি বাত’-এর ১৩৮তম পর্বে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, জনগণনা, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও নেশামুক্তির বার্তা মোদীর

নয়াদিল্লি : সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের নীতি থেকে জনগণনায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ থেকে স্বচ্ছতা অভিযান, পরিবেশ রক্ষা, নেশামুক্ত যুবসমাজ, খেলাধুলোয় প্রতিভার সন্ধান এবং স্থানীয় পণ্যের প্রসার—একাধিক বিষয় নিয়ে দেশবাসীর সঙ্গে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রবিবার ‘মন কি বাত’-এর ১৩৮-তম পর্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আগামী প্রজন্মের জন্য দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণের আহ্বানও জানান তিনি।

পর্বের শুরুতেই আসে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দশ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৬ সালের ২৮-২৯ সেপ্টেম্বর নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে ভারতীয় সেনার সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে অভিযান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বালাকোটের বিমান হামলা থেকে ‘অপারেশন সিঁদুর’—পর পর বিভিন্ন অভিযানের উল্লেখ করে মোদী বলেন, সন্ত্রাসের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ২০০৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লির ধারাবাহিক বিস্ফোরণ এবং ২৬/১১ মুম্বই হামলার কথাও স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তির কথা তুলে ধরে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী।

এর পরেই জনগণনা। মোদীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে জনগণনার প্রথম ধাপ প্রায় শেষ হয়েছে। ৩২ কোটির বেশি পরিবারের তথ্য নথিবদ্ধ হয়েছে। দুর্গম লাদাখ, হিমাচলপ্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং উত্তরাখণ্ডেও কাজ চলছে। উত্তরাখণ্ডের মানা গ্রাম থেকে জনগণনা শুরু এবং সেখানে ৮৩ বছরের পূর্ণিমা রাওয়াতের তথ্য নথিবদ্ধ হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।

ডিজিটাল স্ব-গণনার সুযোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। মোবাইল ফোন থেকেই পরিবারের তথ্য দেওয়া সম্ভব এবং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে বিশেষ পরিচয়পত্র পাওয়ার কথাও বলেন তিনি। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যে ২ কোটি ৬০ লক্ষের বেশি মানুষ এই পদ্ধতিতে নিজেদের তথ্য নথিবদ্ধ করেছেন। জনগণনাকে কেবল সরকারি প্রক্রিয়া নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে সকলকে এতে অংশ নেওয়ার আবেদন করেন মোদী।

এ দিনই প্রয়াত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা অশোক সিংহলের জন্মশতবর্ষ। তাঁকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর আগ্রায় জন্ম নেওয়া সিংহল রামজন্মভূমি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর কাজের কথাও তুলে ধরেন তিনি। সমৃদ্ধ পরিবারে জন্ম, পরিবারের সদস্যদের উচ্চপদে থাকা এবং নিজে আইআইটি-বিএইচইউ-র ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও সিংহল সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রসঙ্গে আসে সোমনাথ ও মোতেরার ইতিহাস। মোদীর বক্তব্য অনুযায়ী, ১০২৬ সালে মাহমুদ গজনীর আক্রমণে সোমনাথ মন্দির ধ্বংসের পাশাপাশি মোতেরার সূর্য মন্দিরও আক্রান্ত হয়েছিল। তার আগে ১০২৫ সালে রাজা প্রথম ভীমদেব মোতেরার সূর্য মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে সেটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। আলাউদ্দিন খিলজির আক্রমণের প্রসঙ্গও তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বহু আক্রমণ ও ধ্বংসের পরেও ভারতের ঐতিহ্য বার বার ফিরে এসেছে।

আজকের মোতেরার পরিবর্তিত চেহারার কথাও বলেন তিনি। সৌরশক্তিনির্ভর ‘সোলার ভিলেজ’ হিসেবে মোতেরার পরিচিতি এবং পর্যটনের প্রসারে সেখানে নৃত্য মহোৎসব-সহ নানা উদ্যোগের উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ইতিহাসের স্মৃতি, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে কী ভাবে একটি জায়গা নতুন পরিচয় পেতে পারে, সেই দিকটিও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগের প্রসঙ্গে তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লীর মনপপাড়াইয়ের একটি উদ্যোগের কথা বলেন মোদী। তামিল স্টাডিজের সঙ্গে যুক্ত এ সেলভারাজ এক ছাত্রের কাছ থেকে প্রাচীন মূর্তির সন্ধান পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। পরে বিভিন্ন জায়গায় মূর্তি ও প্রাচীন মন্দিরের সন্ধান মেলে। দেশের অন্যত্রও স্থানীয় ইতিহাস, পুরাকীর্তি ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন খুঁজে বের করার মতো উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

এর পর স্বচ্ছতার প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন তিনি। ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীর আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলা পরিচ্ছন্নতা উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মোদী। মধ্যপ্রদেশে নদী পরিষ্কার, অন্ধ্রপ্রদেশে পুরনো জলাশয় ও কুয়ো সংস্কার, মুম্বইয়ে সমুদ্রসৈকত পরিষ্কার এবং দিল্লিতে বর্জ্য পৃথকীকরণ নিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগের কথা বলেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গেও যুবক-যুবতী এবং স্থানীয় মানুষের পিকনিক স্পট ও বাজার পরিষ্কারের উদ্যোগের উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, কোনও কাজ শুধু একজনের উদ্যোগে শুরু হলেও যখন তার সঙ্গে আরও মানুষ যুক্ত হন, তখনই তা জনঅংশগ্রহণের রূপ নেয়। স্বচ্ছতা তাই শুধু সরকারি কর্মসূচি নয়, সাধারণ মানুষের অভ্যাস ও দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত— এই বার্তাই দেন মোদী।

পরিবেশ রক্ষার প্রসঙ্গে অসমের সোনাই-রুপাই অভয়ারণ্যে হাতির ফিরে আসার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, দখলমুক্ত হওয়ার পর সেখানে হাতির দল ফের দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিরল পিগমি হগ সংরক্ষণের কথাও তুলে ধরেন তিনি। মাত্র ছ’টি পিগমি হগ নিয়ে শুরু হওয়া সংরক্ষণ কর্মসূচিতে বর্তমানে সংখ্যা ১৯০-এর বেশি হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

সুন্দরবনের ঝড়খালির মহিলাদের ম্যানগ্রোভ রোপণের উদ্যোগও উঠে আসে তাঁর কথায়। তাঁদের অনেকেই বাঘের আক্রমণে স্বামী হারিয়েছেন। ম্যানগ্রোভ রোপণ তাঁদের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি গ্রামের প্রাকৃতিক সুরক্ষাতেও ভূমিকা রাখছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবিকার মধ্যে যে সম্পর্ক রয়েছে, এই উদ্যোগ তারই উদাহরণ বলে তুলে ধরেন তিনি।

নেশামুক্ত যুবসমাজ গড়ার ডাকও ছিল এ দিনের ‘মন কি বাত’-এ। ‘নেশামুক্ত যুব অভিযান’ ১০০ সপ্তাহ চলবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। মাই ভারত স্বেচ্ছাসেবক, এনএসএস, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সংগঠন—বিভিন্ন স্তরের মানুষকে এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

শুধু প্রচার নয়, যুবসমাজকে যুক্ত করার জন্য নানা সৃজনশীল কর্মসূচির কথাও বলেন মোদী। অ্যান্থেম তৈরি, স্লোগান লেখা, পথনাটিকা এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের মতো উদ্যোগের উল্লেখ করেন তিনি। আগামী দিনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ধ্যান শিবিরও এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। উৎসবের সময়েও কোনও যুবক নেশার দিকে চলে গেলে তাকে দূরে ঠেলে না দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

খেলাধুলোয় প্রতিভা খোঁজার প্রসঙ্গে পাঞ্জাবের প্রাক্তন হকি খেলোয়াড় ও কোচ রাজিন্দর সিংহের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮০ সালের অলিম্পিক সোনাজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য রাজিন্দর পরবর্তী সময়ে কোচ হিসেবেও কাজ করেন। বর্তমানে রাউন্ড গ্লাস হকি অ্যাকাডেমির মাধ্যমে গ্রামাঞ্চল থেকে প্রতিভা তুলে আনার কাজে যুক্ত রয়েছেন তিনি। গ্রামের মাঠে অ্যাস্ট্রোটার্ফ তৈরি এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশীয় পণ্য, স্থানীয় শিল্প এবং গ্রামের অর্থনীতির প্রসঙ্গে আসে উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড়ের আমলকী শিল্প। ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট’ বা ‘এক জেলা এক পণ্য’ প্রকল্পের মাধ্যমে আমলকী-ভিত্তিক শিল্পে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মোদী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ১০০টি প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাবিত্রী ফুলে এবং বিন্ধ্যবাসিনী স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা আমলকী দিয়ে ক্যান্ডি, মোরব্বা, জুস, আচার এবং ডাইজেস্টিভ পাউডার তৈরি করছেন। প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, ঋণ এবং বাজারের সুযোগ তাঁদের আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে বলেও জানান তিনি। উৎসবের বাজারে স্থানীয় পণ্য কেনার আহ্বান জানিয়ে ‘ভোকাল ফর লোকাল’-এর উপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

পুষ্টি মাসের প্রসঙ্গও এ দিনের অনুষ্ঠানে ছিল। ছত্তিশগড়ের ‘হর ঘর মুনগা’ উদ্যোগ, গুজরাটে মিলেট-ভিত্তিক রান্নার প্রতিযোগিতা, মহারাষ্ট্রে শিক্ষক, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও অভিভাবকদের মধ্যে পুষ্টি সচেতনতা এবং মিজোরামে ‘পোষণ বাটিকা’ রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগের কথা বলেন মোদী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৯ কোটি উপভোক্তা ইতিমধ্যে ‘পোষণ ট্র্যাকার’-এ নথিভুক্ত হয়েছেন।

শেষ পর্বে ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক বিস্তারের প্রসঙ্গ তোলেন প্রধানমন্ত্রী। থাইল্যান্ডের পন্থৌন থীরখানোনের গণেশভক্তির কথা উল্লেখ করে জানান, চিয়াং মাইয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গণেশ হিমাল মিউজিয়ামে ১০ হাজারের বেশি গণেশমূর্তি রয়েছে। প্রতি রবিবার সেখানে পুজো হয়। বিশেষ তিথিতেও নানা অনুষ্ঠান হয় বলে জানান তিনি। ভারতীয় ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কী ভাবে দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশেও মানুষের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে, তার উদাহরণ হিসেবে এই ঘটনাকে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

‘মন কি বাত’-এর শেষ পর্বে ফের সাধারণ মানুষের উদ্যোগের প্রসঙ্গেই ফিরে আসেন মোদী। নিজের আশপাশে যে সব ইতিবাচক কাজ হচ্ছে, সেগুলির কথা অন্যদের জানাতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, পরিবর্তন সব সময় বড় কোনও কর্মসূচি দিয়ে শুরু হয় না—সাধারণ মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগও এক সময় বৃহত্তর পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা থেকে জনগণনায় অংশগ্রহণ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ থেকে পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ রক্ষা থেকে নেশামুক্ত যুবসমাজ, খেলাধুলোয় প্রতিভার সন্ধান থেকে স্থানীয় পণ্যের প্রসার— ১৩৮-তম ‘মন কি বাত’-এ এই নানা প্রসঙ্গকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সূত্রেই যুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + one =