কলকাতা : বারাসতের জেলা সভাপতি পদ ছাড়ার পর এবার তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকেও ইস্তফা দিলেন প্রবীণ সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। বুধবার দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে একটি দীর্ঘ চিঠি পাঠিয়ে তিনি অল ইন্ডিয়া তৃণমূল মহিলা কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন পদসহ সমস্ত সাংগঠনিক দায়িত্ব ও কমিটি থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। মাত্র তিন দিন আগেই তিনি জেলা সভাপতির পদ ছেড়েছিলেন। এবার সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাজ্যের একাধিক দুর্নীতি, আরজি কর কাণ্ড এবং দলীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন তিনি।
সুব্রত বক্সীকে লেখা চিঠিতে রাজ্যের একাধিক দুর্নীতি ও আরজি কর কাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কাকলি। তিনি লিখেছেন, রেশন দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি এবং একাধিক প্রশাসনিক অনিয়ম সাধারণ মানুষের মনে তীব্র অসন্তোষ ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রাক্তন ছাত্রী হিসেবে ২০২৪ সালের আরজি করের মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার কথাও চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন বারাসতের সাংসদ। তাঁর অভিযোগ, এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার যে চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা গোটা সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ওপরেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে।
চিঠিতে কারও নাম না নিলেও, শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে অত্যন্ত কড়া ভাষায় নিশানা করেছেন কাকলি। লোকসভার মুখ্য সচেতক পদ থেকে কাকলিকে সরিয়ে সম্প্রতি সেই দায়িত্ব আবার কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে কাকলি লিখেছেন, যে পদে থাকাকালীন একজন মহিলা সাংসদের প্রতি অন্য এক ‘অশিক্ষিত ও অভদ্র’ সাংসদের অনুচিত আচরণ রোখা যায় না, এবং এই বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা বা সহানুভূতি পাওয়া যায় না, সেই পদে টিকে থাকার কোনো অর্থ হয় না। এর পাশাপাশি দলের নির্বাচনী ভোটকুশলী সংস্থা ‘আই-প্যাক’ -এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। কাকলির মতে, সংগঠনের ওপর যদি কোনো অস্বচ্ছ এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির প্রভাব বাড়তে থাকে, তবে তা দলের মূল আদর্শ ও ঐতিহ্যের জন্য একেবারেই শুভ লক্ষণ নয়।
সাংসদ অবশ্য স্পষ্ট করেছেন যে তাঁর এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত অহংকার বা অভিমানের বহিঃপ্রকাশ নয়। বরং গণতন্ত্র এবং জনগণের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি নিজেকে সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। তবে তিনি এখনই দল ছাড়ছেন না, দলের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবেই কাজ করবেন। সম্প্রতি লোকসভার মুখ্য সচেতক পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে কাকলি লিখেছিলেন, “১৯৭৬ সাল থেকে পরিচয় এবং ১৯৮৪ সাল থেকে রাজনৈতিক সফরের শুরু। চার দশকের নিষ্ঠার এটাই পুরস্কার মিলল।”
গত মঙ্গলবার কল্যাণীতে বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে কাকলি ঘোষদস্তিদারের উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই বিষয়ে কাকলি বলেছিলেন, প্রশাসন সবার জন্য, সেখানে দলীয় রাজনীতি থাকা উচিত নয়। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর সরকার প্রশাসনিক বৈঠকগুলোতে এই ধরনের “বিশেষ সাংসদদের” আমন্ত্রণ জানাবে এবং রাজ্যের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে দেবে। বারাসতের জেলা সভাপতি পদের পর এবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় মহিলা মোর্চার শীর্ষ পদ থেকে কাকলির এই ইস্তফা, এবং সমসাময়িক দুর্নীতি ও আরজি কর কাণ্ড নিয়ে দলের বিরুদ্ধেই তাঁর এই বিস্ফোরক অবস্থান রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন মোড় দিল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

