সোনাল দিনুশার সোনালি ইনিংসে নিশ্চিত জয় ফসকাল ভারত ! 

ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার কলম্বো টেস্ট এমন এক নাটকীয় পরিণতি পেল, যা দীর্ঘদিন ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে থাকবে। ম্যাচের পঞ্চম দিনে ভারতের সামনে ছিল সহজ সমীকরণ। শ্রীলঙ্কার হাতে ছিল মাত্র চারটি উইকেট, আর গোটা দিন সময়। তাই অধিকাংশেরই বিশ্বাস ছিল, প্রথম সেশনেই বাকি উইকেট তুলে নিয়ে ভারত সিরিজের পাশাপাশি ম্যাচও জিতে নেবে। কিন্তু ক্রিকেটের অনিশ্চয়তাই আবারও প্রমাণিত হল। শ্রীলঙ্কার ব্যাটাররা অবিশ্বাস্য ধৈর্য ও লড়াইয়ের মানসিকতা দেখিয়ে ভারতের জয় ছিনিয়ে নিল।
এই প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় নায়ক সোনাল দিনুশা। প্রথম ইনিংসে শতরানের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও দুর্দান্ত ব্যাটিং করে তিনি অপরাজিত ১৩৩ রান করেন। ভারতের বিপক্ষে এই সিরিজে এটি তাঁর তৃতীয় শতরান। তবে শুধু শতরানই নয়, টেলএন্ডারদের সঙ্গে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে তিনি ভারতের বোলারদের হতাশ করে দেন। নুয়ান্তা, প্রভাত জয়সূর্য, লাহিরু কুমারা এবং অসিতা ফার্নান্ডো—প্রত্যেকেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মূল্যবান সময় কাটান। বিশেষ করে লাহিরু কুমারার ৯০ বলের ধৈর্যশীল ইনিংস এবং অসিতা ফার্নান্ডোর রান না করেও ২৪ বল টিকে থাকা শ্রীলঙ্কার ড্র নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা নেয়।
ভারতীয় বোলাররা দিনের শুরু থেকেই ছন্দ হারিয়ে ফেলেন। নতুন বলে কিংবা পুরোনো বলে, স্পিন বা পেস—কোনও কৌশলই কাজে আসেনি। ২২৯/৬ থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা দিনের শেষে ৪২৯/৯-এ পৌঁছে যায়। ১০৫তম ওভার পর্যন্ত ভারত একটি উইকেটও তুলতে পারেনি। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পিচ মন্থর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় বোলিংয়ের সীমাবদ্ধতা সামনে চলে এসেছে।
বিশেষ করে স্পিন বিভাগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিষেক টেস্ট খেলতে নামা সারাংশ জৈন দীর্ঘ স্পেল বল করলেও মাত্র একটি উইকেট পান। তাঁর বোলিংয়ে বৈচিত্র্যের অভাব স্পষ্ট ছিল এবং দিনুশা সহজেই তাঁকে সামলেছেন। অন্যদিকে মানব সুথার ও রবীন্দ্র জাদেজাও প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেননি। একই ধরনের বাঁহাতি স্পিন আক্রমণ শ্রীলঙ্কার ব্যাটারদের জন্য খুব একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেনি। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, কুলদীপ যাদবকে বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত কি ভারতের জন্য ভুল প্রমাণিত হল? ভিন্ন ধরনের স্পিনার থাকলে হয়তো এই মন্থর পিচেও ফল অন্যরকম হতে পারত।
ভারতের অধিনায়কত্ব ও কৌশল নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। দিনের একেবারে শেষ দিকে শুভমান গিল, যশস্বী জয়সওয়াল ও ধ্রুব জুরেলকে দিয়ে বল করানো হলে তাঁদের বলে উল্লেখযোগ্য টার্ন দেখা যায়। তখন অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, যদি পিচে এতটুকুও সাহায্য থেকে থাকে, তাহলে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন বিকল্প পরিকল্পনা আগে নেওয়া হল না কেন? প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহসী সিদ্ধান্তের অভাবই ভারতের জয়কে দূরে সরিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
শেষ পর্যন্ত ১৫৪তম ওভারে দুই দলই বুঝে যায়, এই ম্যাচে আর ফল বের করা সম্ভব নয়। ড্রয়ের মাধ্যমে ম্যাচ শেষ হলেও দুই দলের অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শ্রীলঙ্কার কাছে এই ড্র কার্যত জয়ের সমান। কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের কাছে এটি নিঃসন্দেহে হারানো সুযোগ। সিরিজ জিতলেও নিশ্চিত জয়ের ম্যাচ ড্র হওয়ায় হতাশা থেকেই গেল। পাশাপাশি টেস্ট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের মূল্যবান পয়েন্টও হাতছাড়া হল। তাই এই ম্যাচ ভারতকে যেমন আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দিল, তেমনই শ্রীলঙ্কাকে দিল আত্মবিশ্বাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + 14 =