হিটম্যানের কাছে ক্ষমা চাইলেন বিসিসিআইয়ের প্রাক্তন নির্বাচক

২০১১ সালের বিশ্বকাপ জয় ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ভারত আবার একদিনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। মুম্বইয়ের ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে কোটি কোটি সমর্থকের স্বপ্নপূরণ হয়েছিল। তবে এই সাফল্যের আড়ালেও ছিল কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল রোহিত শর্মার দলে জায়গা না পাওয়া।
সেই সময় রোহিত শর্মা ভারতীয় ক্রিকেটে উদীয়মান প্রতিভা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন। সীমিত ওভারের খেলায় তাঁর ব্যাটিং দক্ষতা, সময় নিয়ে ইনিংস গড়া এবং বড় শট খেলার ক্ষমতা অনেকের নজর কাড়ে। অনেকেই মনে করেছিলেন, তিনি নিশ্চিতভাবেই বিশ্বকাপ দলে থাকবেন। কিন্তু দল ঘোষণার দিন দেখা যায়, তাঁর নাম তালিকায় নেই। এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছিলেন বহু সমর্থক ও ক্রিকেট বিশ্লেষক।
পরে প্রাক্তন নির্বাচক প্রধান কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, বিষয়টি কোনও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং সম্পূর্ণ দলগত ভারসাম্যের প্রশ্ন ছিল। নির্বাচকেরা এমন একটি দল গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত বোলিং বিকল্পও থাকবে। তাঁদের ভাবনা ছিল ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপজয়ী ভারতের দলকে সামনে রেখে, যেখানে একাধিক ক্রিকেটার ব্যাট ও বল—দুই ক্ষেত্রেই অবদান রাখতে পারতেন।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী এমন খেলোয়াড়দের বেছে নেওয়া হয়, যারা প্রয়োজনে কয়েক ওভার বল করতে পারবেন। কারণ দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় কখনও প্রধান বোলার ব্যর্থ হতে পারেন, কখনও চোটের সমস্যা দেখা দিতে পারে, আবার কখনও ম্যাচের পরিস্থিতি বদলাতে অতিরিক্ত বিকল্প দরকার হয়। তাই নির্বাচকেরা মনে করেছিলেন, বহুমুখী ক্রিকেটাররাই দলের জন্য বেশি কার্যকর হবেন।
এই কৌশল শেষ পর্যন্ত সফলও হয়। যুবরাজ সিং পুরো প্রতিযোগিতায় অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ব্যাট ও বল—দুই দিকেই দলকে এগিয়ে দেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ রান করেন, আবার দরকারের সময়ে উইকেটও নেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। বীরেন্দ্র সেওয়াগ, সচিন তেন্ডুলকর, সুরেশ রায়নারাও প্রয়োজনে কয়েক ওভার বল করেছিলেন। ইউসুফ পাঠান ছিলেন কার্যকর অলরাউন্ডার। ফলে দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে নির্বাচকদের পরিকল্পনা কাজে লেগেছিল।
তবু রোহিত শর্মার বাদ পড়া নিয়ে আক্ষেপ থেকে যায়। শ্রীকান্ত নিজেও পরে স্বীকার করেন, তাঁর জন্য খারাপ লেগেছিল। তিনি জানান, রোহিত সেই সময় বিশ্বকাপ খেলার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু দল গঠনের বিশেষ পরিকল্পনার কারণে তাঁকে বাদ দিতে হয়েছিল।
বিশ্বকাপের আগে রোহিত একদিনের ক্রিকেটে এক হাজার দুইশোর বেশি রান করেছিলেন এবং একাধিক অর্ধশতরানও ছিল তাঁর ঝুলিতে। বিদেশের মাটিতেও তিনি নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছিলেন। তাই অনেকের মতে, তিনি সুযোগ পেলে বিশ্বকাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারতেন।
যদিও সেই হতাশাই পরে রোহিতের জীবনে বড় প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে তিনি বিশ্বের অন্যতম সফল উদ্বোধনী ব্যাটার হয়ে ওঠেন। একদিনের ক্রিকেটে একাধিক দ্বিশতরান, অধিনায়ক হিসেবে সাফল্য এবং অসংখ্য স্মরণীয় ইনিংস তাঁকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
তাই ২০১১ সালের বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া তাঁর কেরিয়ারের এক আক্ষেপ হলেও, সেটাই হয়তো তাঁকে আরও বড় ক্রিকেটার হওয়ার পথ দেখিয়েছিল। কখনও কখনও একটি হারানো সুযোগই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সাফল্যের শুরু হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 16 =