জার্মানিকে হারিয়ে নকআউটে ইকুয়েডর, আইভরিকোস্টের ইতিহাস

জার্মানি ১ : ইকুয়েডর ২

আইভরিকোস্ট ২ : কুরাসাও ০

ফুটবল সুন্দর। খেলাটি এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যা স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা যায় আজীবন। আর সেই মুহূর্তের জন্ম যদি বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে হয়, তবে তো কথাই নেই। আজ রাতে জার্মানি–ইকুয়েডরের ম্যাচের কথাই ধরা যাক। তখন যোগ করা সময়ের খেলা চলছিল। আর এক–দুই মিনিট পরেই শেষ বাঁশি বাজাবেন রেফারি।

ঠিক এমন সময় টিভি ক্যামেরায় ভেসে উঠল এক কিশোরের মুখ। ইকুয়েডরের সেই খুদে সমর্থকটি তখন কাঁদছে। না, এই কান্না বেদনার নয়, এই কান্না হিরণ্ময় এক মুহূর্তের অপেক্ষার। রেফারি বাঁশি বাজালেই যে তার দল জিতবে, উঠবে বিশ্বকাপের নকআউটেও। আর এটি যেনতেন জয় নয়, ২–১ গোলের সে জয়ের অপেক্ষা ছিল চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে। কিশোরটির কান্না কিংবা অপেক্ষা কোনোটিই বিফলে যায়নি।

শেষ বাঁশি বাজতেই ছেলেটির সঙ্গে কান্নায় যোগ দেন আরও অনেকে। জার্মান খেলোয়াড় ও দর্শকদের কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে তখন উন্মাতাল হলুদ ঢেউ।

মাঠে ইকুয়েডরের খেলোয়াড়দের কেউ কাঁদছেন, কেউ হাঁটু গেড়ে বসে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন, কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে উদ্‌যাপন করছেন, আবার কেউ গ্যালারিতে গিয়ে কাছের মানুষদের সঙ্গে মেতেছেন উৎসবে। এসব খণ্ড খণ্ড দৃশ্যের মিলনেই তৈরি হয়েছে ইতিহাস। যে ইতিহাসের নির্মাতা ইকুয়েডর আর শিকার জার্মানি।

জার্মানির সঙ্গে শক্তি–সামর্থ্যের পার্থক্যে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা ইকুয়েডরকে এই বিশ্বকাপে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখেছিল অনেকে। কিন্তু প্রথম দুই ম্যাচে ভালো খেলেও প্রাপ্তি ছিল মাত্র ১ পয়েন্ট। গোল ছিল না।

আইভরিকোস্টের বিপক্ষে তারা হেরেছিল ৯০ মিনিটের মাথায় গোল খেয়ে। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে এলয় রম নামের এক গোলরক্ষকের দানবীয় ১৫টি সেভ গোল পেতে দেয়নি ইকুয়েডরকে। দুই ম্যাচে ১ পয়েন্ট পাওয়া ইকুয়েডরের অন্ধ সমর্থকও হয়তো তখন আর নকআউটে খেলার স্বপ্ন দেখেননি। কিন্তু বিশ্বকাপ তো শূন্য সম্ভাবনা থেকেই বাজিমাত করার গল্প। আর ইকুয়েডর নিজেদের সেরাটা যেন জমিয়ে রেখেছিল জার্মানির জন্যই।

যদিও ম্যাচের শুরুটা বিপর্যয়ের। লিরয় সানের বক্সের ভেতর থেকে বাঁকানো শটের গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি।  কিন্তু ৯ মিনিটের মাথায় সেই গোল শোধ দেন ইকুয়েডরের নিলসন আনহুলো। দ্রুত সমতায় ফেরার পর জার্মানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলেছে ইকুয়েডর।

আক্রমণের জবাব দিয়েছে প্রতি–আক্রমণে এবং তৈরি করেছে দারুণ কিছু সুযোগও। তেমনই এক সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৭৭ মিনিটে দ্বিতীয় গোল পায় ইকুয়েডর। কর্নার থেকে আসা বলে পা ছুঁইয়ে গোলটি করেন ইকুয়েডর ফরোয়ার্ড গঞ্জালো প্লাতা। ইকুয়েডর তখন যেভাবে খেলছিল, গোলটি তাদের প্রাপ্যই ছিল। আর এ গোলই শেষ পর্যন্ত গড়ে দেয় ম্যাচের পার্থক্য। ইকুয়েডর পায় ঐতিহাসিক এক জয়।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানির বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জেতা ইউরোপের বাইরের মাত্র দ্বিতীয় দল হলো ইকুয়েডর। এর আগে এই কীর্তি গড়েছিল শুধু জাপান। পাশাপাশি বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারানো লাতিন আমেরিকার চতুর্থ দল এখন ইকুয়েডর। এর আগে এই কীর্তি গড়েছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও মেক্সিকো।

এই জয়ের পর ‘ই’ গ্রুপে তিন ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের তৃতীয় সেরা দলগুলোর তালিকায় সবার ওপরে থেকে বিশ্বকাপে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে উঠল ইকুয়েডর, যা ২০০৬ বিশ্বকাপের পর দলটির প্রথম নকআউট পর্ব। অন্যদিকে হারলেও ‘ই’ গ্রুপের সেরা হয়েই নকআউটে উঠল জার্মানি। তিন ম্যাচে তাদের পয়েন্ট আইভরিকোস্টের সমান ৬। রাতের অন্য ম্যাচে কুরাসাওকে ২–০ গোলে হারায় আইভরিকোস্ট।  কিন্তু গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় শীর্ষস্থানটা থাকল জার্মানির দখলেই।

রানার্সআপ হয়েই আইভরিকোস্টের ইতিহাস

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠেছে আইভরিকোস্ট। নিকোলাস পেপের জোড়া গোলে কুরাসাওকে হারিয়ে (২–০) শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে জায়গা নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দলটি। নকআউটে উঠতে আইভরি কোস্টের প্রয়োজন ছিল মাত্র ১ পয়েন্ট। এর আগে বিশ্বকাপে তিনবার অংশ নিয়ে প্রতিবারই তাদের বিদায় নিতে হয় গ্রুপ পর্ব থেকে।

তবে এবার কোনো শঙ্কার সুযোগ রাখেনি তারা। ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই এগিয়ে যায় আইভরিকোস্ট। কুরাসাওয়ের রক্ষণভাগের ভুলে বল কেড়ে নেন ইয়ান দিয়োমান্দে। এরপর তাঁর বাড়ানো বল সহজেই জালে পাঠান পেপে। ৬৫তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন সাবেক আর্সেনাল ফরোয়ার্ড পেপে। বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে কুরাসাও গোলরক্ষক এলয় রমকে ফাঁকি দিয়ে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণে। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম তারা এক আসরে দুটি ম্যাচ জিতল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + eight =