রবীন্দ্র ও সুভাষ সরোবরে ফের উদযাপিত হবে ছট পুজো, হিন্দুদের উৎসবের রাজনৈতিকরণ বরদাস্ত করা হবে না : অগ্নিমিত্রা পাল

কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আসন্ন ছট পুজোকে কেন্দ্র করে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এবার কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র সরোবর এবং সুভাষ সরোবরেও ছট পুজোর অনুমতি দেওয়ার জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বুধবার রাজ্যের নগরোন্নয়ন ও পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল পুরনিগমের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে গঙ্গা ঘাট এবং হাওড়া ও কলকাতার বিভিন্ন ছট ঘাট সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এই পরিদর্শনের ফাঁকেই তিনি কড়া ভাষায় বলেন যে, বিগত সরকারের আমলে সংকীর্ণ রাজনীতির কারণে হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠান ও উৎসবে পরিকল্পিতভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সরকারে সেই জমানার পুনরাবৃত্তি আর কখনও হতে দেওয়া হবে না।

এদিন নগরোন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই এবং পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন ঘাট পরিদর্শন করেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি জানান যে, চলতি বছরে আগামী ১৩ থেকে ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ছট পুজো উদযাপিত হবে। উৎসবের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকায় সমস্ত ঘাটের পরিকাঠামো ও বন্দোবস্ত দ্রুত সম্পন্ন করতে ইতিমধ্যেই পুরনিগমকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুসারে শহর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলার সমস্ত জলাশয়, নদী এবং ঘাটগুলির সার্বিক পরিস্থিতির ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে।

মন্ত্রী জানান যে, এবারে কলকাতার সমস্ত জলাশয়, হ্রদ এবং গঙ্গা ঘাটে ছট পুজোর ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ব্রতী ও পুণ্যার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য ঘাট ও জলাশয়ের পাড়ে পেভার ব্লক বসিয়ে অস্থায়ী পথ তৈরি করা হবে। প্রতিটি ছট পুজো প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত শৌচাগার, বায়ো-টয়লেট এবং পোশাক পরিবর্তনের জন্য আলাদা চেঞ্জিং রুমের সুব্যবস্থা থাকবে। বিশেষ করে সূর্যোদয়ের আগে ভোরের অন্ধকারে পুজোর প্রাচীন ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠানের কথা মাথায় রেখে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া পুণ্যার্থীদের সঠিক পথ নির্দেশ করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দিক-সূচক বোর্ড লাগানো হবে।

যেকোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত বা জরুরি পরিস্থিতি এড়াতে প্রতিটি ঘাটে একটি করে জরুরি যোগাযোগের হেল্পলাইন নম্বর উপলব্ধ থাকবে। অতিরিক্ত জনসমাগম ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে ঘাটগুলিতে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হবে। একই সঙ্গে জলের মধ্যে একসঙ্গে অতিরিক্ত লোকজনকে নামতে দেওয়া হবে না। একটি নির্দিষ্ট দল পুজো সম্পন্ন করে ঘাটের বাইরে বেরিয়ে আসার পরই কেবল পরবর্তী দলকে জলে নামার অনুমতি দেওয়া হবে।

ঘাট পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দেন যে, এবারে রবীন্দ্র সরোবরেই ছট পুজোর মূল উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, ওই এলাকায় বসবাসকারী হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও ব্রতীরা তবে পুজো দিতে কোথায় যাবেন। বিগত সরকারের আমলে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কারণে এই হ্রদগুলিতে ছট পুজো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বর্তমান সরকার সেই অবিচার আর হতে দেবে না। তবে পুজোর নিয়ম কঠোর করে বলা হয়েছে যে, পুণ্যার্থীদের জলে নেমে পুজো দেওয়ার পরপরই সমস্ত পুজোর সামগ্রী ও বর্জ্য তৎক্ষণাৎ জলের বাইরে তুলে ফেলতে হবে।

বিশ্বস্ত সূত্রে খবর, রবীন্দ্র সরোবরের চত্বরে ছট পুজোর জন্য চার থেকে পাঁচটি অস্থায়ী ঘাট নির্মাণের জন্য মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হাতে অত্যন্ত কম সময় থাকায় এত কম সময়ের মধ্যে সেখানে কীভাবে এই অস্থায়ী ঘাটগুলি তৈরি করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে পুরনিগমের বাস্তুকার ও ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যেও একধরনের ধন্দ ও অসাঁমজস্য তৈরি হয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৭ সালে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল -এর স্পষ্ট নির্দেশিকা জারির পর থেকে রবীন্দ্র সরোবর ও সুভাষ সরোবরে ছট পুজো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর পরবর্তী সময়ে বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে শহরের বিভিন্ন পৃথক অঞ্চলে কৃত্রিম বিকল্প ঘাট প্রস্তুত করে দেওয়া হতো। এবার রাজ্যের নতুন সরকার ঐতিহাসিক এই দুই সরোবরেই পুনরায় ছট পুজোর অনুমতি দেওয়ার পথ প্রশস্ত করছে।

পরিবেশবিদদের উদ্বেগ ও সরকারের সতর্কবার্তা

অবশ্য সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পরই পরিবেশপ্রেমী মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ‘রবীন্দ্র সরোবর বাঁচাও’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ পরিবেশকর্মী সৌমিত্র মোহন ঘোষ এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, সরকারের পরিবেশ দফতরের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা উচিত। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টও ইকো-সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিকে যেকোনো ধরনের দূষণের হাত থেকে রক্ষা করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। এনজিটি -রও এই বিষয়ে কড়া নির্দেশিকা রয়েছে। রবীন্দ্র সরোবর জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন একটি হ্রদ এবং এখানকার জল ইতিমধ্যেই নানা কারণে দূষিত হয়ে পড়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক অতীতে এই সরোবরের জলে একাধিক মাছের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছিল।

পরিবেশ দূষণের এই আশঙ্কার জবাবে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ছট পুজোর পবিত্র আচার পালনের সময় কোনো অবস্থাতেই জলের পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশের সঙ্গে আপস করা হবে না এবং জল দূষণ একবিন্দুও বরদাস্ত করা হবে না। উৎসবের অনেক আগেই এই সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে। প্রতিটি ঘাটে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত থাকবেন এবং পুজোর পুরো সময় জুড়ে এবং পুজো শেষ হওয়ার পরেও নিরবচ্ছিন্ন সাফাই অভিযান চলবে। কোনোভাবেই যাতে কোনো পুজোর সামগ্রী জলের মধ্যে ফেলে না দেওয়া হয়, তার জন্য বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে।

মন্ত্রী আরও জানান যে, রবীন্দ্র সরোবরে ছট পুজোর মতো বড় ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের এই জটিল ইস্যুটি নিয়ে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। এখন সব মহলের নজর রয়েছে এই বিষয়ের ওপর যে, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পুণ্যার্থীদের ধর্মীয় ভাবাবেগ ও আস্থার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে রাজ্য সরকার কীভাবে এই সার্বিক বন্দোবস্ত সফল করে তোলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − 1 =