শেষ হলো এক স্বর্ণযুগ ! আর্জেন্টিনার জার্সিকে চিরবিদায় লিওনেল মেসির

লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা বিশ্ব ফুটবলে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল। দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণময় ক্যারিয়ারের ইতি টেনে আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি সামাজিক মাধ্যমে একটি আবেগঘন বার্তা প্রকাশ করেছেন। নিজের হাতে লেখা তিনটি পাতার মাধ্যমে তিনি ভক্তদের উদ্দেশে বিদায়ের কথা জানান এবং স্পষ্ট করে দেন যে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।
বিদায়বার্তায় মেসি লিখেছেন, তিনি সবসময় দেশের জার্সির মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। মাঠে প্রতিটি মুহূর্তে লড়াই করেছেন এবং ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার মানুষকে আনন্দ ও গর্ব উপহার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁর মতে, এখন সময় এসেছে নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের সামনে এগিয়ে আসার। তিনি বিশ্বাস করেন, দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হাতে রয়েছে এবং তরুণদের সুযোগ করে দেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অসাধারণ। ২০৭টি ম্যাচে ১২৫টি গোল করে তিনি দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলার হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০০৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের সময় প্রথম ম্যাচেই লাল কার্ড দেখেছিলেন। সেই হতাশাজনক সূচনা থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো তাঁর যাত্রাপথ ছিল অনুপ্রেরণামূলক।
মেসির ক্যারিয়ারে বহু উত্থান-পতন এসেছে। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়ের পর তিনি একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছিলেন। কিন্তু দেশের সমর্থকদের ভালোবাসা এবং দলের প্রয়োজন তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনে। প্রত্যাবর্তনের পর তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালিসিমা জেতান, টানা দু’বার কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন এবং ২০২২ সালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপও জেতান। সেই সাফল্য তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে হার তাঁর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। ম্যাচ শেষে তাঁর চোখের জলই বুঝিয়ে দিয়েছিল, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছেন তিনি। পরে জানা যায়, বিশ্বকাপের মাত্র দু’দিন পর অর্থাৎ ২১ জুলাই তিনি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়ের কারণে তা প্রকাশ করতে কিছুটা সময় নেন।
বিশ্বকাপের পরই মেসির বাবা হোর্হে মেসির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং ৭ আগস্ট তিনি প্রয়াত হন। বাবার মৃত্যু মেসিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। আবেগঘন এক বার্তায় তিনি জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপ জিতে বাবার হাতে নতুন ট্রফি তুলে দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথাও তিনি অকপটে স্বীকার করেছিলেন। সেই বক্তব্যেই অনেকেই তাঁর বিদায়ের ইঙ্গিত খুঁজে পেয়েছিলেন।
মেসির অবসরের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবলের এক সোনালি যুগের সমাপ্তি ঘটল। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় দলকে কেন্দ্র করে যে সাফল্যের গল্প রচিত হয়েছে, তার মূল নায়ক ছিলেন তিনিই। তাঁর নেতৃত্ব, অসাধারণ দক্ষতা এবং অগণিত স্মরণীয় মুহূর্ত শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, গোটা ফুটবল বিশ্বকে সমৃদ্ধ করেছে। যদিও আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর তাঁকে দেখা যাবে না, তবু তাঁর অর্জন, রেকর্ড এবং অনুপ্রেরণার গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

15 + nineteen =