ভোপাল : প্রখ্যাত উর্দু শায়ের, কবি, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যসমালোচক ড. বশীর বদ্র আর নেই। আধুনিক উর্দু গজলের এই কিংবদন্তি কবি বৃহস্পতিবার দুপুর প্রায় ১২টা নাগাদ ভোপালে ৯১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ডিমেনশিয়া রোগে ভুগছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতিশক্তি প্রায় সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল। অনেক সময় কাছের মানুষদেরও চিনতে পারতেন না। গত কয়েক বছরে তাঁর শারীরিক অবস্থারও অবনতি হচ্ছিল। যে মানুষটি সারা জীবন শব্দ দিয়ে মানুষের অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনিই হারিয়ে গিয়েছিলেন স্মৃতির গভীর অন্ধকারে।
তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য অনুরাগী, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা তাঁর জনপ্রিয় শের উদ্ধৃত করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। বহু মানুষের মতে, বশীর বদ্র শুধুমাত্র একজন শায়ের ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের হৃদয়ের ভাষা।
“লোগ টুট জাতে হ্যায় এক ঘর বনানে মে” কিংবা “সর ঝুকাওগে তো পাথর দেবতা হো যায়েগা”—এই ধরনের সহজ অথচ গভীর অনুভূতির শের তাঁকে কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছিল। তাঁর লেখায় ছিল প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকীত্ব, সম্পর্কের ভাঙন, দেশভাগের যন্ত্রণা এবং মানুষের মনের নরম আবেগ। কঠিন অলঙ্কার বা দুর্বোধ্য শব্দের বদলে তিনি সাধারণ কথ্য ভাষাকে গজলের মর্যাদা দিয়েছিলেন। সেই কারণেই তাঁকে আধুনিক উর্দু গজলের অন্যতম পথপ্রদর্শক ও উস্তাদ বলা হয়।
১৯৩৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন বশীর বদ্র। ছাত্রজীবন থেকেই উর্দু সাহিত্য ও গজলের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পরে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল—‘আজাদির পরের গজলের সমালোচনামূলক অধ্যয়ন’। ১৯৭৩ সালে তিনি তাঁর গবেষণাপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেন।
তবে জীবনের ব্যস্ততাই যেন তাঁর নিজের ডিগ্রিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। শায়রি, মুশায়েরা এবং অধ্যাপনার জগতে তিনি এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে, পিএইচডির ডিগ্রি সংগ্রহ করতেই আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি। অবশেষে তাঁর স্ত্রী ড. রহত বদ্রের উদ্যোগে ২০২১ সালে, প্রায় ৪৬ বছর পর, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ডাকযোগে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি পাঠায়। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই ডিগ্রি যেন তাঁর দীর্ঘ সাহিত্য ও শিক্ষাজীবনের এক আবেগঘন স্বীকৃতি হয়ে ওঠে।
শুধু কবি হিসেবেই নয়, একজন সম্মানিত শিক্ষাবিদ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল বিস্তৃত। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু পড়াতেন। পরে ১৯৭৪ সালের ১২ আগস্ট মেরঠ কলেজের উর্দু বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি মেরঠ ছেড়ে ভোপালে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৭৪ থেকে ১৯৯০—এই সময়কালকে তাঁর সাহিত্যজীবনের স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা হয়। এই সময়েই তাঁর গজল নতুন উচ্চতায় পৌঁছায় এবং দেশ-বিদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
বশীর বদ্রকে সাধারণ কথ্য ভাষায় রোমান্টিক, আবেগময় এবং গভীর অর্থবহ গজল লেখার জন্য বিশেষভাবে মনে রাখা হবে। তিনি গজলের জগতে বহু নতুন ও প্রচলিত শব্দ যুক্ত করেছিলেন। এমন বহু দৈনন্দিন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন, যেগুলি আগে ঐতিহ্যবাহী উর্দু শায়রিতে খুব একটা দেখা যেত না। তাঁর লেখার ভঙ্গি ছিল সহজ, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা ছিল অসাধারণ।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে ‘ইমকান’, ‘আহটें’, ‘কুল্লিয়াত-এ-বশীর বদ্র’ এবং ‘উজালে আপনী ইয়াদোঁ কে’। তাঁর কবিতা ও গজল আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সমান জনপ্রিয়।
ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের যন্ত্রণা নিয়েও তিনি একাধিক স্মরণীয় শের লিখেছিলেন। শিমলা চুক্তির সময় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে তাঁর একটি বিখ্যাত শের শুনিয়েছিলেন—
“দুশমনি জমকে করো, কিন্তু ইয়ে গুঞ্জাইশ রহে,
জব কভি হাম দোস্ত বন যায়েঁ তো শরমিন্দা না হোঁ।”
এই একটি শেরই যেন বশীর বদ্রের মানবিক দর্শনকে তুলে ধরে—বিভাজন থাকলেও সম্পর্কের দরজা যেন পুরোপুরি বন্ধ না হয়।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট গীতিকার, কবি ও চিত্রনাট্যকার জাভেদ আখতার। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “আজ আমাদের ভাষা উর্দু আরও কিছুটা দরিদ্র হয়ে গেল। বশীর বদ্রের মতো সুরেলা শায়ের চিরদিনের জন্য আমাদের মহফিল ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর শায়রি ও শব্দের জাদু আমাদের স্মৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবে।”
সাহিত্যপ্রেমীদের মতে, বশীর বদ্রের প্রয়াণ শুধুমাত্র একজন কবির মৃত্যু নয়, উর্দু গজলের এক আবেগময় যুগের অবসান। তাঁর লেখা শের, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর অনুভূতির ভাষা—সবই আগামী প্রজন্মের কাছে উর্দু সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।

