ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, দাবি ট্রাম্পের ; চূড়ান্ত অনুমোদনের কথা মানতে নারাজ তেহরান

ওয়াশিংটন/তেহরান : ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং সেই কারণেই তেহরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত রাখা হয়েছে বলে দাবি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরই ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এখনও পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত চুক্তি অনুমোদন করা হয়নি। ফলে পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের স্তর পর্যন্ত আলোচনা পৌঁছেছে এবং একটি খসড়া চুক্তির কাঠামো ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। তাঁর কথায়, আলোচনায় অগ্রগতির জেরেই ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সামরিক হামলা ও বোমাবর্ষণের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে।

ট্রাম্পের দাবি, প্রস্তাবিত সমঝোতার আওতায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের আলোচনাপর্ব শুরু করার বিষয় রয়েছে। তাঁর মতে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। সপ্তাহান্তে ইউরোপে কূটনৈতিক বৈঠকের সময় এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, একটি সমঝোতা স্মারকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে নীতিগতভাবে সম্মতি দিয়েছে আমেরিকা, ইজরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরিন, কুয়েত, জর্ডন ও মিশর-সহ একাধিক দেশ। তবে ওয়াশিংটনের আশাবাদী অবস্থানের বিপরীতে অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তেহরান। ইরানের একাধিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, কোনও চূড়ান্ত চুক্তির খসড়া এখনও অনুমোদিত হয়নি। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলির দাবি, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়ে গেছে এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির আগে সেগুলির নিষ্পত্তি প্রয়োজন।

ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, খসড়া চুক্তির অধিকাংশ বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাঁর কথায়, কিছু বিষয়ে মতভেদ বজায় রয়েছে এবং ইরান তার জাতীয় স্বার্থ ও নির্ধারিত ‘রেড লাইন’-এর সঙ্গে কোনও আপস করবে না।

তবে ইরানের কয়েকটি সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব কিছুটা কমেছে। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে তেহরান সর্বশেষ প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বিশেষ করে ইরানের স্থগিত সম্পদ মুক্ত করা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরমাণু আলোচনা কাঠামো নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রে খবর, বুধবার কাতারের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে নিবিড় আলোচনা হয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত চলা বৈঠকে বাকি মতভেদ দূর করে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হয়।

চলতি বছরের শুরুতে শুরু হওয়া মার্কিন-ইরান সংঘাত পশ্চিম এশিয়ার বৃহৎ অংশকে অস্থির করে তুলেছে। এর প্রভাব পড়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথের উপর। বিশ্বের তেল পরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর ও কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত ওই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা বহাল থাকবে। পাশাপাশি তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, যে কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় ইরান যাতে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

দুই পক্ষই আলোচনায় অগ্রগতির কথা স্বীকার করলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রকাশ্য অবস্থানের ফারাক স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, চূড়ান্ত সমঝোতার আগে এখনও একাধিক কূটনৈতিক বাধা অতিক্রম করতে হবে। ফলে আগামী কয়েক দিনই নির্ধারণ করবে, সর্বশেষ আলোচনাপর্ব আদৌ স্থায়ী সমাধানের পথ খুলতে পারে কি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 17 =