বয়স যে তাঁর কাছে শুধুই একটা সংখ্যা, তা আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন বিরাট কোহলি। ৩৭ বছর বয়সেও ব্যাট হাতে তাঁর দাপট একটুও কমেনি। বরং সময়ের সঙ্গে যেন আরও পরিণত হয়ে উঠছেন ভারতীয় ক্রিকেটের এই মহাতারকা। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ব্যাট হাতে ঝড় তোলার পাশাপাশি গড়লেন এক অনন্য নজির। কোহলির ৭৪ রানের দুরন্ত ইনিংসে ভর করে কিউয়িদের বিরুদ্ধে জয় দিয়েই সিরিজ অভিযান শুরু করল শুভমান গিলের ভারত। বোলারদের দাপটে প্রথমে ব্যাট করে মাত্র ১৮৫ রানেই গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে সেই লক্ষ্য সহজেই পেরিয়ে যায় ভারত।
অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে টসে জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ভারত অধিনায়ক শুভমান গিল। শুরু থেকেই তাঁর সিদ্ধান্তের যথার্থতা প্রমাণ করতে থাকেন ভারতীয় বোলাররা। নতুন বলে অর্শদীপ সিং এবং গুর্নুর ব্রারের আগুনে বোলিংয়ে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে কিউয়ি ব্যাটিং লাইনআপ। নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট হারিয়ে বড় রান তোলার সুযোগই পায়নি নিউজিল্যান্ড। অর্শদীপের বলে মাত্র ৯ রান করে ফেরেন উইল ইয়ং। এরপর হেনরি নিকোলসকেও সাজঘরের পথ দেখান ভারতীয় পেসার। শেষ পর্যন্ত চার উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে বড়সড় ধস নামান তিনি।
অন্যদিকে, নিজের অভিষেকেই নজর কাড়েন তরুণ পেসার গুর্নুর ব্রার। বল হাতে তিনটি উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও নজর কাড়েন তিনি। বিশেষ করে নিজের বোলিংয়ে টম ল্যাথামের দুরন্ত ক্যাচটি ছিল ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ। অংশুল কাম্বোজও বাউন্সারের সাহায্যে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন কিউয়ি ব্যাটারদের। তাঁর ঝুলিতে যায় দুটি উইকেট।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন টিম সেইফার্ট। ৪৩ বলে ৩৮ রান করেন তিনি। গ্লেন ফিলিপ্সের ব্যাট থেকে আসে ৩০ এবং ড্যারিল মিচেলের সংগ্রহ ২৮ রান। তবে শেষদিকে ব্লেয়ার টিকনারের ঝোড়ো ব্যাটিং না হলে আরও কম রানে গুটিয়ে যেতে পারত কিউয়িরা। মাত্র ২৩ বলে ৩৪ রান করে দলের স্কোর কিছুটা সম্মানজনক জায়গায় পৌঁছে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৪০.২ ওভারে ১৮৫ রানেই শেষ হয় নিউজিল্যান্ডের ইনিংস।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় ভারত। রানের খাতা খোলার আগেই প্যাভিলিয়নে ফিরে যান রোহিত শর্মা। তবে তাতে বিশেষ সমস্যা হয়নি। শুভমান গিলের সঙ্গে জুটি বেঁধে ইনিংস সামলানোর দায়িত্ব নেন বিরাট কোহলি। আর সেখানেই তৈরি হয় নতুন ইতিহাস। ব্যক্তিগত ১২ রান পূর্ণ করতেই ওয়ানডে ক্রিকেটে তিন নম্বরে ব্যাট করে ১৩ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। কাইল জেমিসনের বল লং লেগের দিকে ঠেলে এক রান নিয়ে এই কৃতিত্ব অর্জন করেন কোহলি।
এই নজিরের মাধ্যমে আরও একবার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন ভারতীয় তারকা। ওয়ানডেতে তিন নম্বরে ব্যাট করে ১৩ হাজার রান করার কৃতিত্ব বিশ্বের আর কোনও ব্যাটারের নেই। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক রিকি পন্টিং। তাঁর সংগ্রহ ১২,৬৬২ রান। তৃতীয় স্থানে কুমার সঙ্গকারা (৯,৭৪৭)। অর্থাৎ, কোহলির ধারেকাছেও নেই বাকি ব্যাটাররা। মাত্র ২৫১টি ইনিংসে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। তিন নম্বরে তাঁর ব্যাটিং গড় ৬১-এরও বেশি। রয়েছে ৪৮টি শতরান এবং ৭০টি অর্ধশতরান।
নিউজিল্যান্ডের মাটিতেও কোহলির রেকর্ড বরাবরই উল্লেখযোগ্য। এই ম্যাচের আগে সেখানে ১৩টি ওয়ানডে খেলে ৫৯০ রান করেছিলেন তিনি। ছিল একটি শতরান এবং চারটি অর্ধশতরান। বুধবারের ম্যাচেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখলেন তিনি।
তবে বৃষ্টির কারণে দু’বার খেলা বন্ধ হওয়ায় ম্যাচের সমীকরণ বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত ভারতের জয়ের লক্ষ্য কমে দাঁড়ায় ১৪৩ রানে। সেই রান তুলতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি ভারতীয় দলকে। ৫১ বলে ৭৪ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন কোহলি। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৩টি চার ও একটি ছক্কা। তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দেন শুভমান গিল।
শেষ পর্যন্ত পাঁচ উইকেট হাতে রেখেই জয় তুলে নেয় ভারত। সিরিজের শুরুতেই বড় বার্তা দিল টিম ইন্ডিয়া। তবে কোহলির ভক্তদের মনে একটা আক্ষেপ থেকেই যাবে। বৃষ্টি যদি ম্যাচের দৈর্ঘ্য কমিয়ে না দিত, তাহলে হয়তো আরও একটি দুরন্ত শতরানের সাক্ষী থাকতেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। আপাতত ১৩ হাজার রানের নতুন ইতিহাস এবং ৭৪ রানের ইনিংস দিয়েই আবারও বুঝিয়ে দিলেন কিং কোহলি বয়স তাঁর কাছে সত্যিই নিছক একটা সংখ্যা।

