টানা দ্বিতীয়বার টি–টোয়েন্টি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত

সব্যসাচী বাগচী 
ডান অ্যান্ড ডাস্টেড!
‘হিস্ট্রি রিপিট অ্যান্ড হিস্ট্রি ডিফিট’।
২০২৪ সালে রোহিত শর্মা যেখানে শেষ করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই, ২০২৬ সালে ‘হিটম্যান’-এর সামনে কাজ শেষ করলেন সূর্য কুমার যাদব।
২০০৭, ২০২৪-এর পর এবার ২০২৬। মাঝের ২০১৪ বাদ দিলে চারবার ফাইনালে গিয়ে প্রথমবার কোনও দল তিনবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতল। আর সেটা এক ও অদ্বিতীয় ভারত।
২০২৪ এর এবার ২০২৬। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারত প্রথম দল হিসেবে পরপর দু’বার ভুবনজয়ী হল।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ভারত হল প্রথম দল যারা, ঘরের মাঠে যারা ঘরের মাঠে ট্রফি জয়ের স্বাদ পেল।
ভেন্যু আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম হলেও, মেগা ফাইনালে এসে হোঁচট খেতেই হবে, এমন দিব্যি কে দিয়েছে? ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বরের রাতে জসপ্রীত বুমরাহ ছিলেন। তবে স্কোরবোর্ডে এত রান ছিল না। যদিও বুম বুম বুমরাহ রবিবারের রাতে আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন যে কেন তাঁকে ‘ওয়ান্স ইন অ্যা জেনারেশন’ বলা হয়। ৪-০-১৫-৪। এই বোলিং ফিগার সবটা বলে দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৫০ ওভারের কাপ যুদ্ধের সেই ফাইনালে অক্ষর প্যাটেল ছিলেন না। মহাত্মা গান্ধীর সাবরমতীর শহরের এই মাঠ অক্ষরের হোম গ্রাউন্ড। ভারতীয় ড্রেসিংরুমে এই অলরাউন্ডারকে আবার ‘বাপু’ বলে ডাকা হয়। আসল ‘বাপু’-র শহরের মাঠে নেমে
কিউইদের একাই বুঝে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখালেন অক্ষর। তাঁর বোলিং ফিগার ৩-০-২৭-৩।
সেই ফাইনালে ঈশান কিশানের এমন আগুনে ক্যাচ লুফে নেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। তাঁকে সাজঘরে বসে দলের হার হজম করতে হয়েছিল। তবে ৮ মার্চের রাতে এই একই ভেন্যুতে ঈশান শুধু ব্যাটে ঝড় তুলে ক্ষান্ত থাকলেন না, তিনটি চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া ক্যাচ নিলেন। আর সেখানেই ম্যাচের ভাগ্য স্থির হয়ে যায়।
কাপ যুদ্ধের ফাইনাল নামক শাহি বিরিয়ানিতে সব মশলা সমানভাবে পড়ল। ভারতের ব্যাটাররা যেন বোফর্স চালালেন! স্কোরবোর্ডে উঠে গেল ৫ উইকেটে ২৫৫! যা রেকর্ড। কারণ এর আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ১৭৫। বড় রান স্কোরবোর্ডে তোলার পর দুই গুজরাতি নিজের হোম গ্রাউন্ডে নিউজিল্যান্ডকে বুঝে নিলেন। ১৫৯ রানে অল আউট। স্কোরবোর্ডই সেটা বলে দিচ্ছে। ফলে ৯৬ রানে হেলায় হারিয়ে ‘হিস্ট্রি ডিফিট এবং রিপিট’ করল টিম ইন্ডিয়া।
রবিবারের সন্ধ্যায় মোতেরায় ভারতীয় ক্রিকেটের ‘হুজ হু’-দের মধ্যে সবাই ছিলেন। বিশেষভাবে নজর কাড়লেন দুই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত শর্মা। তবে বিরাট কোহলির দেখা পাওয়া গেল না। তাই যদি ভেবে থাকেন, তাহলে আপনার ভাবনাচিন্তা একেবারে ভুল!
বিরাট ভীষণভাবে ছিলেন! অভিষেক শর্মার মধ্যে ছিলেন! মনে পড়ে ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সেবারের কাপ যুদ্ধের ফাইনালের আগে পর্যন্ত ‘কিং কোহলি’র ব্যাটে ছিল রানের খরা। তবে মেগা ফাইনালে নিজের মেজাজে ধরা দিয়েছিলেন কিং কোহলি’। সেদিন বার্বাডোজে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল ৫৯ বলে ৭৬। সাত উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
এবার অভিষেকের ব্যাটেও কি তেমনই ইতিহাস রচিত হতে চলেছে! নক-আউট পর্ব থেকেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ট্রেডিং ছিলেন যুবরাজ সিংয়ের ছাত্র। তিনি কি বিরাটের মতো ফাইনালে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারবেন? চলছিল আলোচনা। এত ট্রোলিংয়ের পরেও অবিচল ছিলেন পঞ্জাব তনয়।
গোল্ডেন ডাকের হ্যাটট্রিক। সুপার এইট থেকে সেমি-ফাইনালে, লাগাতার ফ্লপ হওয়ার পরেও তাঁর উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন গৌতম গম্ভীর-সূর্য কুমার যাদব। মেগা ফাইনালে চেনা রুদ্র মেজাজে ধরা দিলেন বাঁহাতি ওপেনার। আউট হওয়ার আগে ২৪৭.৬১ স্ট্রাইক রেট বজায় রেখে করলেন ২১ বলে ৫২! সঙ্গে ছিল ৬টা চার ও ৩টি ছক্কা।
সঞ্জু স্যামসন নিয়ে যত লেখা যায়, সেটাই কম। কেরল থেকে সঞ্জুকে নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে সবচেয়ে বেশি ছেলে-খেলা হয়েছে। অথচ তিনিই কিনা ইডেন গার্ডেন্স, ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের পর এবার মোতেরাতেও বিপক্ষকে নিয়ে ছেলে-খেলা করে গেলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ভার্চুয়াল কোয়ার্টার ফাইনালে অপরাজিত ৫০ বলে ৯৭। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমি-ফাইনালে ‘সেল্ফ লেস’ মেজাজে ৪২ বলে ৮৯। আর এবার তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও অনেক বড়। তবে এবারও সেই রোহিতের মডেল অনুসরণ করলেন সঞ্জু। হাতে ওভার ছিল। ঈশান কিশান চালিয়েই ব্যাট করছিলেন। তিনি সময় নিতে পারতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত মাইলস্টোন নয়, দল আগে। তাই এবারও মারতে গেলেন। এবং ৪৬ বলে ৮৯ রান করে জিমি নিশামের বলে আউট হলেন। মারলেন ৫টি চার ও ৮টি ছক্কা। স্ট্রাইক রেট ১৯৩.৪৭।
এবারের কাপ যুদ্ধে ঈশানও নিজের দাপট দেখালেন। কামব্যাক ঘটিয়ে এমন ব্যাটিং দাপট ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব কম লেখা রয়েছে। ৩০০-র বেশি রান করার পাশাপাশি ফাইনালে করলেন ২৫ বলে ৫৪। জিমি নিশাম সেই ওভারের পঞ্চম বলে ঈশানকে আউট করার পর, ভারত কিছুটা খেই হারাল। সূর্যের দুর্বোধ্য ব্যাটিংয়ের জন্য। অধিনায়ক কেন যে এমন একটা অদ্ভুত শট খেললেন, সেটা নিজেই বলতে পারবেন। এক ওভারে তিন উইকেট নিয়ে কিউইদের কিছুটা স্বস্তি দিলেন নিশাম। ২০২ রানে ৩ উইকেট থেকে ভারত ২০৪ রানে ৪ উইকেট!
শেষ বেলায় শিবম দুবে (২৬* বলে ৭) – তিলক ভার্মা (৮* বলে ৬) দ্রুত রান করার চেষ্টা করলেন। সফলও হলেন দুই বাঁহাতি। ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৫৫ রান! তবুও প্রশ্ন ছিল ভারত ‘হিস্ট্রি রিপিট ও ডিফিট’ করতে পারবে? দুই কিউই ওপেনার ফিন অ্যালেন এবং টিম সাইফার্ট চরম ফর্মে ছিলেন। কিন্তু এই ভারতীয় দল বাকিদের থেকে একেবারে আলাদা। অনেক বেশি আগ্রাসী।
অক্ষর এর আগে ঘরের মাঠে টেস্টে সাফল্য পেয়েছেন। ২০২১ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এখানেই খেলেছিলেন দুটি টেস্ট। পিঙ্ক বলে টেস্ট ছাড়াও ছিল লাল বলের ম্যাচ। দুই টেস্টের তিনি ইনিংসে মোট ১১৮ রানে ১৬ উইকেট নিয়েছিলেন ‘বাপু’। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনাল যে আলাদা মঞ্চ। আরও বড় লড়াই। কলজের লড়াই। এই লড়াইয়েও সফল ‘মোস্ট আন্ডাররেটেড’ অক্ষর। বুমরাহও বোঝালেন শরীর খুব ভাল না থাকলেও, জ্বর নিয়েও বিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা তিনি রাখেন। অবশেষে অনেকদিন পর হাসতে দেখা গেল গৌতম গম্ভীরকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + 14 =