নয়াদিল্লি : গুজরাট বিধানসভায় বুধবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হল ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) বিল। এর ফলে উত্তরাখণ্ডের পর গুজরাট দেশের দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে এই আইন কার্যকর করার পথে এগোল। বিল পাসের পর বিধানসভায় শাসকদলের বিধায়কেরা স্লোগান দেন ও টেবিল চাপড়ে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। অন্যদিকে বিরোধী সদস্যরা একাধিক প্রশ্ন তুলে আপত্তি জানান।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল ‘গুজরাট বিল নম্বর ১৭ অফ ২০২৬’ হিসেবে বিধানসভায় ইউসিসি বিল পেশ করেন। প্রায় সাত ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর বুধবার তা পাস হয়। আলোচনায় সামাজিক ও আইনি নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উঠে আসে, যার মধ্যে বিবাহ প্রথা, তালাক, একত্রবাস সম্পর্ক, ‘শাহ বানো’ মামলা ও অন্যান্য বিতর্কিত বিষয়ও ছিল।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই আইন কোনও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়, বরং সমতা, ন্যায় ও জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করাই এর লক্ষ্য। তিনি জানান, বিশেষত মহিলাদের ও শিশুদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি জনজাতি সমাজের প্রথা-সংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ রাখা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে তফসিলি উপজাতি ও কিছু প্রথাগত সম্প্রদায়কে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে বিবাহের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তা না করলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। সব ধর্মের জন্য বিবাহ বিচ্ছেদের নিয়ম এক করা হয়েছে এবং আদালতের বাইরে দেওয়া তালাক অবৈধ বলে গণ্য হবে। পাশাপাশি, একত্রবাস সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই ধরনের সম্পর্ক থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানদের বৈধ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং তারা আইনি অধিকার পাবে। এছাড়া, কেউ উইল না করে মারা গেলে তার সম্পত্তি বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানের মধ্যে সমানভাবে বণ্টনের বিধান রাখা হয়েছে।
আলোচনায় উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি পরিচয় গোপন করে প্রতারণামূলক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তোলেন এবং এ ধরনের অপরাধ রুখতে কড়া পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। অন্যদিকে কংগ্রেস সদস্য ইমরান খেদাওয়ালা ‘হালালা’ প্রথা নিয়ে ভুল ব্যাখ্যার অভিযোগ তুলে আপত্তি জানান। কংগ্রেস বিধায়ক শৈলেশ পারমার সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা না হলেও ইউসিসি নিয়ে অতিরিক্ত রাজনৈতিক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তিনি আইনের বাস্তব প্রয়োগ ও প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
এর আগে প্রশ্নোত্তর পর্বের পর কংগ্রেসের অমিত চাভদা রাজ্যে পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের ঘাটতির বিষয়টি উত্থাপন করলে বিধানসভায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং তীব্র বাকবিতণ্ডা দেখা যায়। অন্যদিকে, আহমেদাবাদে এআইএমআইএম কর্মীরাও এই বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামে।
এদিকে, গুজরাটে ইউসিসি বিল পাসকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ তিনি বলেন, সকল নাগরিকের জন্য এক আইন প্রণয়ন করা বিজেপির প্রতিষ্ঠালগ্নের অঙ্গীকার এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে দেশ। উত্তরাখণ্ডের পর গুজরাটে এই বিল পাস হওয়ায় তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেল এবং সমর্থনকারী সকল বিধায়ককে অভিনন্দন জানান। অমিত শাহ আরও বলেন, দেশ তুষ্টিকরণের ভিত্তিতে নয়, বরং সকলের জন্য সমান আইনের ভিত্তিতেই পরিচালিত হওয়া উচিত। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশে সমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এই বিলটি প্রস্তুত করা হয়েছে। বিরোধীরা বিলটির উদ্দেশ্য ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এটি পাস হয়ে যায়।

