জাল পাস বিক্রি ও ইউনেস্কো লোগো ব্যবহার মামলা: ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন

কলকাতা : দুর্গাপূজার জাল পাস বিক্রি এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ইউনেস্কোর লোগো অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিল ব্যাঙ্কশাল আদালত। বুধবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) অফিস থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার তাঁকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে হাজির করা হলে আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র আইনি সওয়াল-জবাব চলে।

আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় যুক্তি দেন যে, পুরো ঘটনাটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, ‘মাস আর্ট’ নামক একটি সংস্থা (যার সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী মধুচন্দা সেন যুক্ত) ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দুর্গাপূজার প্রিভিউ শো এবং বিশেষ পাসের টিকিট বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছে। আদালতকে জানানো হয় যে, যদিও ইউনেস্কোর সঙ্গে সংস্থার আনুষ্ঠানিক চুক্তি ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তবুও ইউনেস্কো বাণিজ্যিক বা আর্থিক লাভের জন্য তাদের লোগো ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ওই প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সাল থেকেই নিয়ম ভেঙে পাস বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেছে।

তদন্তকারীদের আইনজীবীর দাবি, ‘মাস আর্ট’-এর প্রধান তথা ইন্দ্রনীলের স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হওয়ার দিনই সেই অর্থের একটি অংশ প্রাক্তন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টেও স্থানান্তরিত হয়েছিল। এছাড়া এই মামলায় তিনজন সাক্ষীর গোপন জবানবন্দি (সিআরপিসি-র ১৬৪ ধারা অনুযায়ী) রেকর্ড করা হয়েছে, যাঁরা সরাসরি এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে প্রাক্তন মন্ত্রীর যোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন। পাশাপাশি, সরকারি টেন্ডার বা দরপত্র প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অন্যদিকে, আদালতে সমস্ত অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে তিনি দাবি করেন, তিনি শুরু থেকেই তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করে আসছেন। এমনকি তাঁর ফোন নিষ্ক্রিয় বা উপলব্ধ না থাকার অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট জানানো হয়, “অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর থেকেই আমার মোবাইল ফোনটি ইডির বাজেয়াপ্ত হেফাজতে রয়েছে।”

প্রাক্তন মন্ত্রী আরও দাবি করেন যে, টিকিট বিক্রির পুরো বিষয়টি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল এবং এই সংক্রান্ত দায়িত্ব একটি বেসরকারি সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল, যাকে বর্তমানে তদন্তের আওতায় আনা হয়নি। তাঁর প্রশ্ন, যে চারজন ব্যক্তি নিজেদের ‘ভুক্তভোগী’ বলে দাবি করছেন, তাঁরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন? ইন্দ্রনীল জোর দিয়ে বলেন যে, ‘মাস আর্ট’ বা এর সঙ্গে সংযুক্ত অন্য কোনো সংস্থা (যেমন— জিডি ক্রিয়েশনস, থার্ড লাইন)-র কোনো পদে তিনি কখনই ছিলেন না। এছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও কোনো লুকোচুরি বা গোপনীয়তা ছিল না বলে তাঁর দাবি।

পাবলিক প্রসিকিউটর পাল্টা সওয়ালে জানান যে, যখন ওই দরপত্রগুলি আহ্বান করা হয়েছিল, সেই সময় অভিযুক্ত নিজে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর কার্যকালেই এই সমস্ত অনিয়ম সংঘটিত হয়েছিল। উভয় পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শোনার পর ব্যাঙ্কশাল আদালতের বিচারক প্রাক্তন মন্ত্রীর জামিনের আবেদন খারিজ করে তাঁকে আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।

উল্লেখ্য, এই তদন্তের অংশ হিসেবে ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও বর্তমানে কড়া নজরদারির আওতায় রয়েছে। মূলত জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে বউবাজার থানায় মামলা রুজু হয়, যার সূত্র ধরেই প্রথমে পুলিশ ও পরবর্তীতে ইডি তদন্ত শুরু করে। ইতিপূর্বে গ্রেফতারি এড়াতে কলকাতা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছিলেন ইন্দ্রনীল সেন, যা খারিজ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট থেকেও তিনি কোনো আইনি সুরক্ষা বা স্বস্তি পাননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 2 =