শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিলের রুদ্ধশ্বাস জয়

শেষ বাঁশি বাজল যখন, হিউস্টনের স্টেডিয়ামজুড়ে একটাই রং—হলুদ। সবুজ ঘাসের ওপর ছুটে এল হলুদ ঢেউ। হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন কার্লো আনচেলত্তি—চোখে সেই পরিচিত স্থিরতা, কিন্তু ভেতরে নিশ্চয়ই এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আর একটু দূরে, দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। যেন তিনি নিজেই বুঝে উঠতে পারছেন না, ঠিক কী করে ফেললেন!

নব্বই মিনিটের নাটক পেরিয়ে যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির পায়ের ঠিকানায় এসে পৌঁছেছিল একটা বল—আর সে বলটা ডান পোস্টের ভেতর দিক ছুঁয়ে জালে গিয়ে বসল, যেন কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানায় চিঠি পৌঁছে দিয়েছে ডাকপিয়ন। জিওন সুজুকির হাত সে বল ফেরাতে পারত না। ৬৮ হাজার ৭৭৭ মানুষের মধ্যে যেন অর্ধেকের বুক থেকে চিৎকার বেরিয়ে এল হাহাকারের মতো, বাকি অর্ধেক সেটাকে স্বস্তির শ্বাস দিয়ে গিলে নিল। ব্রাজিল জিতল ২-১ গোলে। ব্রাজিল টিকে থাকল বিশ্বকাপে!

প্রথমার্ধে যে ব্রাজিলকে দেখা গেল, সে যেন ঘুমের ভেতরে হাঁটা কোনো মানুষ। পা নড়ছে, কিন্তু চোখ নেই। দখলে এগিয়ে থেকেও জাপানের অর্ধে গিয়ে কিছুটা দিশেহারা। যেন জাপানি সুশৃঙ্খল ডিফেন্সের দেয়ালে মাথা কুটে মরছে। একবার মাতেউস কুনিয়া বিশ গজ দূর থেকে গায়ের ভার হারিয়েও শট নিলেন, সুজুকি সাবধানে মুঠো করে রাখলেন বলটা। এই একটিই ছিল সেরা চেষ্টা। কখনো কখনো দেখা গেছে আনাড়িপনার মহড়াও।

ব্রুনো গিমারাইস বল মারলেন লুকাস পাকেতার মুখে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র চিৎকার করলেন গিমারাইসকে—আগে পাস দাও, পরে ভাবো এবং সবচেয়ে অবাক করার মতো—দুবার ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা একে অপরকে ট্যাকেল করলেন নিজেদের মধ্যেই। কোচ কার্লো আনচেলত্তি বেঞ্চে বসে কী ভাবছিলেন তখন—সেটা তাঁর মুখের রেখাই বলে দিচ্ছিল।

২৯ মিনিট। দানিলো মাঝমাঠে বল হারালেন। কাইশু সানো সেটা তুলে নিলেন। আর তারপর যা হলো, সেটা যেন কোনো সাইলেন্ট ফিল্মের দৃশ্য। কাসেমিরো সামনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু সানো যেন তাঁকে দেখতেই পেলেন না। বিশ গজ ছুটলেন, তারপর ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে সরাসরি গোলপোস্টে শট। বল ঢুকে গেল আলিসনের জালে। জাপানের সমর্থকেরা হিউস্টনকে আচমকা টোকিও বানিয়ে দিলেন। সানোর এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে প্রথম গোল। বড় মঞ্চে প্রথম গোল, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে।

দ্বিতীয়ার্ধে আনচেলত্তি মাঠে নামালেন এনদ্রিককে। পাকেতার বদলে, চোটের কারণে। কিন্তু পরিবর্তনটা শুধু খেলোয়াড়ের নয়, মেজাজের, কৌশলেরও। ব্রাজিল যেন ঘুম থেকে উঠল।

৫৪ মিনিট। ক্রস এল পেছনের পোস্টে, কাসেমিরো ঝাঁপিয়ে হেড করলেন। তোমিয়াসু ও সুজুকি দুজনেই ছুঁলেন বলটা। গোললাইনের কথা মনে হচ্ছিল, কিন্তু ভিএআর জানাল—হয়নি। হলো দুই মিনিট পরে।

গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির ক্রস ভেসে এল পেছনের পোস্টে। কাসেমিরো লাফ দিয়ে হেড করলেন গোলমুখে—১-১। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সিতে যে দৃশ্য অনেকবার দেখা গেছে, সেটা এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে। ৩৪ বছর ১২৬ দিন বয়সে বিশ্বকাপে গোল করলেন কাসেমিরো—১৯৯৮ সালে ডেনমার্কের বিপক্ষে গোল করা বেবেতোর পর ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলদাতা।

তারপর এল একটা মুহূর্ত। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বল পেলেন, নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখলেন, তোমিয়াসুকে নাটমেগ করলেন, এগিয়ে গিয়ে শট নিলেন—সুজুকি বুড়ো আঙুল দিয়ে পোস্টে ঠেলে দিলেন। এ গোল হলে কী হতো, সেই প্রশ্নের উত্তর অজানাই থাকল।

ম্যাচ ঢুকল শেষ দশ মিনিটে। তারপর যোগ করা সময়। ছয় মিনিট যোগ হয়েছিল। সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে রায়ান বল জিতলেন ওপরে, ভেতরে দিলেন গিমারাইসকে। গিমারাইস শুট করতে পারতেন। করেননি। মার্তিনেল্লিকে দিলেন। মার্তিনেল্লি বললেন বলটাকে—যাও। আর বল গেল সুজুকির হাতের আঙুল ছুঁয়ে ডান পোস্টের ভেতর দিক দিয়ে জালের গভীরে।

হিউস্টন স্টেডিয়ামে তখন যে শব্দ উঠল, সেটা বিজয়ের নয়, স্বস্তির।

ব্রাজিল এগিয়ে গেল শেষ ষোলোতে। আইভরিকোস্ট বা নরওয়ে অপেক্ষায়। কিন্তু এই দলকে আরও এক হতে হবে। প্রথমার্ধের সেই ছত্রভঙ্গ ব্রাজিল এবং দ্বিতীয়ার্ধের জেগে ওঠা ব্রাজিল—দুটো এক দেশের পাসপোর্ট বহন করলেই এক দল হয় না।

তারপরও হিউস্টনে হলদে উৎসব হয়। আর সেই উৎসবে একটাই নাম—মার্তিনেল্লি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 3 =