লস অ্যাঞ্জেলসে ইরান-বিরোধী প্রতিবাদ, প্রশ্ন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে 

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হওয়ার মুখে নতুন এক বিতর্ক ঘিরে ফেলেছে ইরানকে। মাঠে নামার আগেই দেশটির বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একদল ইরানি-আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী, প্রবাসী নাগরিক এবং প্রাক্তন ফুটবলার। তাঁদের দাবি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের একাধিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ইরানকে বিশ্বকাপে খেলতে দেওয়া উচিত নয়। এই দাবিকে সামনে রেখে সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলসে বিক্ষোভও সংগঠিত করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলির অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। সেই দেশের লস অ্যাঞ্জেলস শহরে সিটি হলের সামনে জড়ো হন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে ইরানের সরকার বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের একটি ইতিবাচক ও গ্রহণযোগ্য ছবি তুলে ধরতে পারে। অথচ দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর নিয়ন্ত্রণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে। তাই বিশ্বকাপের মতো বিশ্বমঞ্চে ইরানের উপস্থিতি সরকারকে পরোক্ষভাবে সুবিধা করে দিতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেক তরুণ-তরুণীও ছিলেন, যাঁদের পরিবার ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে বসবাস শুরু করেছে। তাঁদের বক্তব্য, বাইরের দুনিয়া অনেক সময় ইরানের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত নয়। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব দেখলে সাধারণ মানুষ মনে করতে পারেন সব কিছু স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বহু নাগরিক নানা ধরনের চাপ ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন বলে তাঁদের দাবি।
বিক্ষোভস্থলে এমন কয়েকজন ক্রীড়াবিদের ছবিও প্রদর্শন করা হয়, যাঁরা অতীতে সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়ার কারণে নিগ্রহের শিকার হয়েছেন বলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ। তাঁদের স্মরণ করে শ্রদ্ধাও জানানো হয়। উপস্থিত প্রাক্তন ফুটবলাররা বলেন, ক্রীড়াবিদদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত এবং রাজনৈতিক কারণে তাঁদের উপর চাপ সৃষ্টি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই আন্দোলনে অংশ নেন ইরানের প্রাক্তন জাতীয় দলের ফুটবলার আসগর আদিবিও। তিনি বর্তমান জাতীয় দলের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, জাতীয় দল দেশের সাধারণ মানুষের অনুভূতির প্রতিনিধিত্ব করছে না। বরং শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যেই দল পরিচালিত হচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের শক্তিশালী নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছায়া জাতীয় ফুটবলের উপর রয়েছে। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিক্ষোভ শেষে অংশগ্রহণকারীরা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় মিছিল করেন। সেখানে শুধু বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিরোধিতা নয়, ইরানে রাজনৈতিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের দাবিও তোলা হয়। আন্দোলনকারীদের একাংশ জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ চলাকালীন স্টেডিয়ামের মধ্যেও তাঁরা নিজেদের প্রতিবাদ জারি রাখবেন। বিশেষ করে ইরানের ম্যাচগুলিতে বিভিন্ন প্রতীক ও ব্যানারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
এখনও পর্যন্ত ফিফা বা ইরান ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এই বিক্ষোভ নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে বিশ্বকাপ শুরুর আগে এই ঘটনা ফুটবল ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। আগামী দিনে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি গ্যালারিতেও যে রাজনৈতিক বার্তা এবং প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি শোনা যেতে পারে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে ইরানের প্রথম ম্যাচের আগেই বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে এই বিতর্ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × two =