অবশেষে পর্দা নামল ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল দলের বিশ্বকাপ অভিযানে। আজারবাইজানের বাকুতে কিউবার বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে ৬-৪ গোলে জয় তুলে নিয়ে প্রতিযোগিতা শেষ করল বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের ছেলেরা। শেষ ম্যাচে দুরন্ত ফুটবল উপহার দিয়ে জয় এল ঠিকই, কিন্তু সামগ্রিক ফলাফলে সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই ভারতীয় শিবিরের। বিশ্বকাপের মঞ্চে ৮৭তম স্থানে শেষ করতে হল সৌম্যজিৎ সরকারদের। টুর্নামেন্টের শুরুতে যে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল ‘ব্লু কোল্টস’, পরবর্তী সময়ে সেই ছন্দ ধরে রাখতে না পারার খেসারত দিতে হল দলকে।
কিউবার বিরুদ্ধে ম্যাচে অবশ্য শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল ভারত। প্রতিপক্ষকে কোনওরকম সময় না দিয়েই প্রথম মিনিটে গোলের খাতা খুলে দেন ভিক্টর লালমপুইয়া। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ছয় মিনিট। এর মধ্যেই ব্যবধান দ্বিগুণ করে ভারত। হেডের সাহায্যে জালে বল জড়িয়ে দেন নিবাস মিতেই। শুরুতেই দুই গোলের লিড পেয়ে আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়ে যায় ভারতীয় ফুটবলারদের। ১২ মিনিটে আরও একটি গোল করে ব্যবধান বাড়ান লালরেমরুয়াতফেলা।
এরপরেও থামেনি ভারতীয় দলের গোলের ক্ষুধা। ২২ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন ভিক্টর। পরের মিনিটেই ফের গোল নিবাসের। মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে জোড়া ধাক্কা খেয়ে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে কিউবা। ২৬ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ভারতের ব্যবধান ৬-১ করে দেন লালরেমরুয়াতফেলা। ম্যাচের শুরুতেই ছয় গোল করে কার্যত একতরফা লড়াইয়ের ছবি তুলে ধরেছিল ভারত।
তবে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও ম্যাচের শেষদিকে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে হয় ভারতীয় শিবিরকে। বক্সের আশপাশে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারা এবং একের পর এক ভুল পাসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবধান কমাতে শুরু করে কিউবা। ভারতীয় রক্ষণে তৈরি হয় একাধিক সমস্যা। একসময় যে ম্যাচে ছয় গোলের ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেখানেই শেষপর্যন্ত চার গোল হজম করতে হয় ভারতকে। যদিও শেষ পর্যন্ত ৬-৪ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে বিবিয়ানো ফার্নান্ডেজের দল। বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে জয় পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সামগ্রিক ব্যর্থতার ছবি আড়াল করা যায়নি।
অথচ এই বিশ্বকাপে ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল বেশ আশাব্যঞ্জকভাবে। প্রাথমিক পর্বে একের পর এক ম্যাচে ভালো পারফরম্যান্স করে নজর কেড়েছিল ভারতীয় দল। লাওস, ক্যামেরুন এবং বাহরিনের মতো প্রতিপক্ষকে হারিয়ে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল সৌম্যজিৎরা। পাশাপাশি গ্রানাডার বিরুদ্ধে ম্যাচে আটকে দিয়ে পয়েন্ট সংগ্রহ করেছিল তারা। ফলে প্রতিযোগিতার একটা পর্যায়ে পাঁচ দলের গ্রুপে শীর্ষস্থানেও উঠে এসেছিল ভারত। সেই সময় দলকে ঘিরে প্রত্যাশা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু গ্রুপ পর্বের শেষ দিকে এসে ছবিটা বদলে যায়। পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার লড়াইয়ে ভারতের সামনে ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ সেনেগাল। সেই ম্যাচে জিততে না পারলে পরের পর্বে যাওয়ার রাস্তা কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সেই লড়াইয়ে নিজেদের সেরাটা দিতে ব্যর্থ হয় ভারতীয় ফুটবলাররা। সেনেগালের কাছে ৬-১ গোলে হেরে যায় দল। এই বড় ব্যবধানের পরাজয়ই ভারতের বিশ্বকাপ অভিযানকে কার্যত কঠিন করে দেয়। ‘কে’ গ্রুপে তৃতীয় স্থানে শেষ করতে হয় তাদের। পাঁচ ম্যাচে ভারতের সংগ্রহ ছিল ১০ পয়েন্ট।
গ্রুপ পর্বে একাধিক ম্যাচে ভালো ফুটবল খেলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারাই ভারতের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সেনেগালের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে হার দলের দুর্বলতাগুলিকে সামনে এনে দেয়। অন্যদিকে কিউবার বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে ছয় গোল করার ক্ষমতা দেখালেও রক্ষণভাগের ভুল এবং পাসিংয়ের সমস্যা ফের চোখে পড়েছে।
শুরুতে সম্ভাবনা তৈরি করেও প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছতে পারল না ভারতের অনূর্ধ্ব-১৫ দল। শেষ ম্যাচের জয় অবশ্য কিছুটা ইতিবাচক স্মৃতি হয়ে থাকবে ফুটবলারদের কাছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে ৮৭তম স্থান নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আরও ভালো ফল করতে হলে আক্রমণের পাশাপাশি রক্ষণ, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও উন্নতি করতে হবে ভারতীয় দলকে।

