মেসির রূপকথা, ১৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার পুনর্জন্ম

একটা ম্যাচ বদলে যেতে কত সময় লাগে? কত সময়ের মধ্যে গল্প হঠাৎ নিজের স্ক্রিপ্ট ছিঁড়ে নতুন কাহিনি লিখে ফেলে? এই ম্যাচে সেই উত্তর—১৩ মিনিট।

ঘড়িতে তখন ম্যাচের ৭৯ মিনিট। স্কোরবোর্ডে মিসর ২, আর্জেন্টিনা ০। বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা তখন বিদায়ের দরজায় দাঁড়িয়ে, কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপের এক নিষ্ঠুরতম অঘটন। তারপর মাত্র ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে ভোজবাজির মতো বদলে গেল সব হিসাব। ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড, লিওনেল মেসির সমতাসূচক শট, আর যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের নিঃশব্দ ঘাতকী হেড—তিনটা গোল, তিন রকম আবেগ, একটাই ফল। আর্জেন্টিনা ৩, মিসর ২।

অথচ আটলান্টা স্টেডিয়ামে শুরুটা কিন্তু অন্য গল্পের ইঙ্গিত দিয়েছিল। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজের চৌদ্দতম ম্যাচ খেলতে নেমে মেসি মিরোস্লাভ ক্লোজার রেকর্ড ছুঁলেন। কিন্তু রেকর্ডের আনন্দ মিলিয়ে যেতে সময় লাগল না। ১৫ মিনিটেই আর্জেন্টিনার রক্ষণ যেন ঘুমিয়ে পড়ল একলহমায়! কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে টপকে শূন্যে উঠলেন ইয়াসের ইব্রাহিম, মাথা ছুঁইয়ে বল জড়ালেন জালে। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে হারের পর এই প্রথম প্রথমার্ধে গোল হজম করল আর্জেন্টিনা।

চার মিনিট বাদে সুযোগ এল শোধ তোলার। বক্সে তালিয়াফিকো ফাউলের শিকার, পেনাল্টি। বল বসল মেসির পায়ে। যিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা, তাঁর জন্য তো সহজতম কাজ হওয়ার কথা এটি। যে পায়ে বল আঠার মতো লেগে থাকে, সেই পা-ই মাঝেমধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে।

শট গেল গোলরক্ষকের বাঁ দিকে, আর মোস্তফা শোবের ঠিক সেদিকেই ঝাঁপালেন। বিশ্বকাপে আটটির মধ্যে চারটি পেনাল্টি মিস—এক আসরে দুটো মিস করা প্রথম ফুটবলার হয়ে রইলেন মেসি। আকাশের দিকে তাকালেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক, যে দৃশ্যটাও মনে করিয়ে দেয়, দেবতারা কখনো কখনো মানুষ হয়ে যান।

তারপরও আর্জেন্টিনা চেষ্টা কম করেনি। ম্যাক আলিস্টারের হেড লক্ষ্যে থাকল না, মেসির ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরল, আলভারেজের প্রচেষ্টা রুখে দিলেন শোবের।

দ্বিতীয়ার্ধে যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল মিসর। ৫৮ মিনিটে হাইসেম হাসানের কারিকুরি, মোহাম্মদ সালাহর পাস আর জিকোর ফিনিশ—গোল হয়েও বাতিল হলো ভিএআরে, লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওপর ফাউলের কারণে। কিন্তু ওই বাতিল হওয়া গোলটাই যেন ছিল ভবিষ্যতের পূর্বাভাস।

ঠিক ৯ মিনিট পর, পাল্টা আক্রমণে সালাহর পাস থেকে হাসান, আর হাসানের কাটব্যাক থেকে জিকো এবার আর ভুল করলেন না। মিসর ২-০। আটলান্টার গ্যালারিতে তখন লাল-সাদা পতাকার উৎসব, আর আর্জেন্টিনার বেঞ্চে নেমে আসে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা।

অন্য যেকোনো দল হলে এখানেই গল্পটা থেমে যেতে পারত। কিন্তু মেসির আর্জেন্টিনা যেন থেমে যাওয়ার জন্য আসেনি বিশ্বকাপে। ৭৯ মিনিটে মেসির ক্রস থেকে ছয় গজ দূর থেকে হেডে ব্যবধান কমালেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, শোবেরের হাত ছুঁয়েও বল জালে জড়াল।

৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ড বাদে, মন্তিয়েলের সাজানো বল ধরে প্রথম টাচেই মেসির শট। বার-পোস্টের নিচের দিক ছুঁয়ে বল জালে—২-২। বিশ্বকাপে তাঁর ২১ নম্বর গোল, এই বিশ্বকাপের ৮ নম্বর। মেসির চোখেমুখে তখন সেই পুরোনো জেদ, যা পেনাল্টির লজ্জা মুছে দিয়ে নতুন করে লেখাচ্ছিল ম্যাচের শেষ পাতা।

তারপরও ম্যাচ শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আলভারেজের লম্বা বল খুঁজে নিল লাওতারো মার্তিনেজকে, ডান প্রান্ত ধরে সময় নিয়ে বাড়ানো ক্রসে হেডে জড়িয়ে দিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। নিখুঁত এক জ্যামিতির মতো বল জালের কোণে গিয়ে ঠেকল। আর্জেন্টিনা ৩, মিসর ২।

মিসর বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের এত কাছে গিয়েও ফিরে গেল খালি হাতে। আর আর্জেন্টিনা দেখাল, চ্যাম্পিয়নরা সব সময় ভালো খেলে জেতে না। কখনো কখনো তারা শুধু হারে না বলেই জিতে যায়।

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই মেসির চোখে জল। সেই জল হারের নয়, সেই জল সেই বিশ্বাসের। যে বিশ্বাস বলে, চ্যাম্পিয়নরা কখনো হারতে হারতেও হারে না। তারা ম্যাচ ঠিক বের করে আনে।

সময় লাগে ১৩ মিনিট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen + 17 =