সঞ্জুর ব্যাট নাকি বুমরাহের স্পেল ? কোনটি নিশ্চিত করল ভারতের সেমিফাইনাল ?

ইডেন গার্ডেন্সে সেই রাতের পর আর কোনও ‘যদি-কিন্তু’ টিকে থাকেনি। ২২০ রান তাড়া করতে হত কি না, কিংবা সঞ্জু স্যামসনের অবিশ্বাস্য ইনিংসও কি যথেষ্ট হত—এ সব প্রশ্ন আপাতত বাতিল। কারণ, ফল একটাই—ভারত জিতেছে, সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে সূর্যকুমার যাদবের দল। তবে ম্যাচের গভীরে তাকালে বোঝা যায়, ব্যাট হাতে জয়ের ছবি আঁকা হলেও তার ক্যানভাস তৈরি করেছিলেন জসপ্রীত বুমরাহ।
ব্যাট হাতে শেষটা যিনি করে এসেছেন, তিনি সঞ্জু স্যামসন। চাপের মুখে দাঁড়িয়ে ৯৭ রানের ইনিংস খেলে তিনি দেখিয়েছেন ম্যাচ জেতানোর মানে কী। কিন্তু সেই চাপ কি আদৌ এতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হত, যদি প্রতিপক্ষের স্কোর আরও ২০–২৫ রান বেশি হতো? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ভারতের বোলিং ইনিংসের মাঝখানে একটি ওভারের মধ্যে।
শুরুর দিকে কিন্তু ম্যাচের রাশ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের হাতেই। পাওয়ার প্লে পার হতেই রান তোলার গতি বাড়ায় তারা। ইডেনের ব্যাটিং-সহায়ক উইকেটে বল ব্যাটে আসছিল সুন্দর ভাবে। বিশেষ করে শিমরন হেটমায়ার শুরু থেকেই আগ্রাসী। বড় শট খেলতে তাঁর কোনও দ্বিধা ছিল না। অন্য প্রান্তে তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন রস্টন চেজ়। ভারতের স্পিন আক্রমণ তখন কার্যত নিষ্প্রভ। অধিনায়ক সূর্যের তুরুপের তাস বলে পরিচিত বরুণ চক্রবর্তীও ব্যাটারদের থামাতে পারছিলেন না। ১১ ওভার শেষে স্কোর যখন এক উইকেটে ৯৯, তখন মনে হচ্ছিল হাসতে হাসতেই ২০০ পেরিয়ে যাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়।
এর আগেই অবশ্য একটা সুযোগ পেয়েছিল ভারত। পাওয়ার প্লে-তে বুমরাহর বলে চেজ়ের সহজ ক্যাচ ফেলেন অভিষেক শর্মা। তাতে ক্যারিবিয়ানদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। পরের ওভারে বরুণ ১৭ রান দেওয়ায় পরিস্থিতি বেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। তখন আর ঝুঁকি না নিয়ে ১২তম ওভারে বুমরাহকেই আক্রমণে আনেন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব।
সেখানেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। প্রথম দু’টি বলে গতি কমিয়ে ব্যাটারদের ভাবনায় ফেলেন বুমরাহ। তারপর হঠাৎ গতি বাড়ানো তৃতীয় বল। পুল মারতে গিয়ে ভুল করেন হেটমায়ার। বল ব্যাটের কানায় লেগে পিছনে সঞ্জুর দস্তানায় জমা পড়ে। রিভিউ নিয়েও রক্ষা হয়নি। চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা হেটমায়ারের বিদায়ই ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ইনিংসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা। আন্তর্জাতিক টি–টোয়েন্টিতে বুমরাহর বিরুদ্ধে তাঁর এই ব্যর্থতা নতুন নয়—পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ মেলে।
এই ওভারের সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল মানসিক। যখন বুমরাহ বল করতে আসেন, তখন ক্রিজে দু’জন সেট ব্যাটার। ওভার শেষ হতে না হতেই সেখানে দু’জন নতুন মুখ। তার ফলও সঙ্গে সঙ্গে পায় ভারত। পরের তিন ওভারে রান ওঠে মাত্র ২২। হার্দিক পাণ্ড্য ও অক্ষর পটেলের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ইনিংস এগোয় ধীরে। শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজ় ১৯৫ পর্যন্ত পৌঁছলেও, হেটমায়ার ও চেজ় আরও কয়েক ওভার খেললে যে স্কোর ২২০ ছুঁতে পারত, তা ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন অধিনায়ক শাই হোপ নিজেই।
আর সেই অতিরিক্ত ২০–২৫ রান না হওয়াই ভারতের জয়ের রাস্তা সহজ করে দেয়। শুরু থেকেই ওভার প্রতি ১১–১২ রানের চাপ না থাকায় সঞ্জুরা পরিকল্পনা মেনে খেলতে পেরেছেন। তাই স্কোরবোর্ডে নায়ক সঞ্জু হলেও, জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন বুমরাহ। তাঁর একটি ওভারেই তৈরি হয়েছিল ইমারত—যার উপর দাঁড়িয়েই ব্যাট হাতে শেষ ছোঁয়া দেন সঞ্জু স্যামসন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + 20 =