মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে—সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কেকেআর তাঁকে ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকায় কিনেছিল, সেই টাকার ভবিষ্যৎ কী? বাংলাদেশি পেসার কি আদৌ এই অর্থ পাবেন? আইপিএলের সাধারণ নিয়ম ক্রিকেটারদের আর্থিক সুরক্ষা দিলেও, মুস্তাফিজুরের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম কার্যকর হচ্ছে না, কারণ তাঁর ছাঁটাইয়ের পেছনে রয়েছে বিসিসিআইয়ের নির্দেশ, ফ্র্যাঞ্চাইজির নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়। আইপিএলের নীতি অনুযায়ী, নিলামে যে দামে কোনও ক্রিকেটারকে কেনা হয়, সেই অর্থ ফ্র্যাঞ্চাইজিকে দিতেই হয়। প্রতিযোগিতা শুরুর আগেই ক্রিকেটারের চুক্তিমূল্যের ১৫ শতাংশ অগ্রিম দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
সেই হিসেবে ৯.২০ কোটির ১৫ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা মুস্তাফিজুরের আইপিএল শুরু হওয়ার আগেই পাওয়ার কথা ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ, কোনও ফ্র্যাঞ্চাইজি যদি নিজে থেকে কোনও ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দেয়, কিংবা ক্রিকেটার চোটের কারণে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যান, তা হলেও তিনি সম্পূর্ণ চুক্তিমূল্য পাওয়ার অধিকারী হন। এমনকি শৃঙ্খলাভঙ্গ বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে বাদ পড়লেও অনেক ক্ষেত্রে অর্থপ্রাপ্তিতে প্রভাব পড়ে না। অর্থাৎ, আইপিএলের কাঠামো ক্রিকেটারবান্ধব। কিন্তু মুস্তাফিজুরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁকে কেকেআর স্বেচ্ছায় ছেঁটে ফেলেনি, তিনি চোটেও পড়েননি, কোনও শৃঙ্খলাভঙ্গও করেননি। বিসিসিআই জানিয়েছে, ‘চারপাশের উদ্ভূত পরিস্থিতির’ কারণে তাঁকে খেলানো সম্ভব নয়। এই ‘পরিস্থিতি’ রাজনৈতিক-প্রশাসনিক চাপ ও নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট নয়।
ফলে তাঁর ছাঁটাইকে আইপিএলের বেতনপ্রাপ্তির সাধারণ শর্তের আওতায় ফেলা যাচ্ছে না। আইপিএলের সব ক্রিকেটারের বেতন বিমার আওতায় থাকে, যাতে প্রতিযোগিতা চলাকালীন বা ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার পর চোট পেলে ক্রিকেটার ক্ষতিপূরণ পান। বিদেশি ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে বিমা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দেওয়া হয়, আর ভারতীয় কেন্দ্রীয় চুক্তির ক্রিকেটারদের বেতন অনেক সময় বোর্ড নিজেই বহন করে। কিন্তু বিমা কর্তৃপক্ষের মতে, মুস্তাফিজুরের ছাঁটাই ‘চোট’ বা ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি-প্রণোদিত ছাঁটাই’—কোনও ক্যাটেগরিতেই পড়ে না। ফলে কেকেআর তাঁকে অর্থ দিতে বাধ্য নয়, এমনকি বিমা থেকেও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ নেই।
এটি আইপিএলের বিমা কাঠামোর বড় ফাঁককে সামনে এনেছে, যেখানে প্রশাসনিক-নির্দেশিত বাদ পড়ার ক্ষেত্রে ক্রিকেটারের আর্থিক সুরক্ষা নেই। এই অবস্থায় মুস্তাফিজুরের সামনে দু’টি পথ খোলা—ভারতের আইনি ব্যবস্থায় মামলা করা, অথবা কোর্ট অফ আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টস (CAS)-এ আপিল করা। কিন্তু আইপিএল ভারতের আইনের এক্তিয়ারে হওয়ায়, কোনও বিদেশি ক্রিকেটার এ দেশে মামলা করতে গেলে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা, ও বিচারব্যবস্থার সময়সাপেক্ষ কাঠামোর মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে, CAS আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার সর্বোচ্চ আইনি মঞ্চ হওয়ায় সেখানে আবেদন করা তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হলেও, তার রায় মানতে আইপিএল কর্তৃপক্ষ কতটা বাধ্য থাকবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। মুস্তাফিজুরের জন্য এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। এটি শুধু একজন ক্রিকেটারের বেতন না পাওয়ার ঘটনা নয়, বরং ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের ফলে খেলোয়াড়দের আর্থিক অধিকার সুরক্ষার যে সীমাবদ্ধতা আছে, তারও বড় উদাহরণ।

