ইউজিসি-র নতুন নির্দেশিকার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি সুপ্রিম কোর্টের

নয়াদিল্লি : ইউজিসি-র নতুন কিছু নিয়মকে কেন্দ্র করে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার একটি মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালত ওই বিতর্কিত নির্দেশিকার উপরে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছে। শুনানি চলাকালীন আদালত বলে, “আমরা কি ক্রমশ একটি পশ্চাৎপদ বা রক্ষণশীল সমাজের দিকে যাচ্ছি?” মামলাকারীর তরফে এ দিন সওয়াল করেন আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। বিতর্ক ইউজিসি প্রমোশন অব ইকুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশনস রেগুলেশনস, ২০২৬ ঘিরে। গত ১৩ জানুয়ারি এর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছিল। আদালত জানিয়েছে, ইউজিসি-র এই নির্দেশিকা উচ্চশিক্ষার প্রগতিশীল কাঠামোর ওপর আঘাত আনছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারকে এই নিয়মগুলো ফের খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনে নতুন করে খসড়া তৈরি করতে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নতুন নিয়মগুলি স্থগিত ও ২০১২ সালের পুরনো নিয়মগুলিই কার্যকর থাকবে।

উল্লেখ্য, এই নতুন নিয়ম ইউজিসি এনেছিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরই। ২০১২ সালের ইউজিসি অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন রেগুলেশন কার্যকরভাবে রূপায়ণ হচ্ছে না— এই অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন রাধিকা ভেমুলা এবং আবেদা সালিম তাদভি। রাধিকা ভেমুলা হলেন গবেষক রোহিত ভেমুলার মা। আর আবেদা তাদভি হলেন মুম্বইয়ের চিকিৎসক পড়ুয়া পায়েল তাদভির মা। রোহিত ও পায়েল দু’জনেই জাতিভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ইউজিসিকে নতুন, শক্তিশালী নিয়ম তৈরির নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মেনেই ইউজিসি ২০২৬ সালের নতুন ইক্যুইটি রেগুলেশন জারি করে।

ইউজিসি ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ‘ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন (প্রোমোশন অব ইক্যুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশনস) রেগুলেশনস, ২০২৬’। এর মাধ্যমে ২০১২ সালের জাতিভিত্তিক বৈষম্য বিরোধী নিয়ম সংশোধন করা হয়। নতুন নিয়মে ‘কাস্ট-বেসড ডিসক্রিমিনেশন’ বা জাতিভিত্তিক বৈষম্যকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এমন বৈষম্য হিসেবে, যা শুধুমাত্র তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি উপজাতি (এসটি) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) সদস্যদের বিরুদ্ধে করা হয়। অর্থাৎ সংজ্ঞার মধ্যেই সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকরা কার্যত বাদ পড়ছেন।

এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈষম্য রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে হেল্পলাইন চালু করা, মনিটরিং ব্যবস্থা গঠন, নিয়মিত রিপোর্ট ইউজিসির কাছে পাঠানো ইত্যাদি। এই ব্যবস্থার দায়িত্ব সরাসরি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের উপর চাপানো হয়েছে। উপাচার্য, অধ্যক্ষদের ব্যক্তিগতভাবে নিয়ম মানার নিশ্চয়তা দিতে হবে। যদি কোনও প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশিকা না মানে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। যেমন, নতুন কোর্স অনুমোদন বন্ধ করা, ইউজিসির বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া বা এমনকী প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি প্রত্যাহার পর্যন্ত করা হতে পারে।

নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে মূল আপত্তি এসেছে সংজ্ঞা নিয়েই। সমালোচকদের বক্তব্য, ইউজিসি যেভাবে ‘কাস্ট-বেসড ডিসক্রিমিনেশন’ সংজ্ঞায়িত করেছে, তাতে সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা পুরোপুরি সুরক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, বৈষম্য যে কোনও দিক থেকেই হতে পারে। কিন্তু নতুন নিয়মে শুধু সংরক্ষিত শ্রেণির মানুষদেরই ‘ভিকটিম’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। ফলে সাধারণ শ্রেণির কেউ যদি বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তাঁদের জন্য কোনও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির পথ থাকছে না। আরও অভিযোগ, এই নিয়মে ‘ভুল অভিযোগ’ বা মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে কোনও সুরক্ষা নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুরু থেকেই অপরাধী ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে, যা ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − seven =