কলকাতা : শনিবার রাজ্যে এসে সরকারি সভার সঙ্গেই দলীয় সভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই সভার কথা বলেই বাংলার উন্নয়নে কেন্দ্রের ভূমিকার কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বাংলার নবনির্মাণ করবে বিজেপি। বাংলায় এখন আমাদের সরকার নেই। তার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে বাংলার উন্নয়ন করছি আমরা। আজও ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছে।
ব্রিগেডের সমাবেশে আসার পথে বিজেপি নেতা-কর্মীরা নানা জায়গায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলছিলেন, তার প্রতিধ্বনি শোনা গেল এ বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে। তিনি বলেন, নিজেদের কুর্সি যাচ্ছে দেখে, এখানকার নির্মম সরকার উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। সভায় আসতে বাধা দিতে যানজট করেছে। বিজেপির পতাকা ফেলে দিয়েছে। সেতু বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু নির্মম সরকার দেখে নাও, এই জনসমাগম তোমরা রুখতে পারোনি। রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিগেড ময়দানের সভা থেকে সরব হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই সঙ্গে দিলেন ‘হুঁশিয়ারি’-ও। দলের সমাবেশ থেকে মোদীর বক্তব্য, সময় গোনা শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই দিন আর দূরে নেই। এই বারে আইনের শাসন শুরু হবে। যে আইন ভাঙবে, তাকে খুঁজে খুঁজে বার করা হবে।
কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যে বাধার অভিযোগে ফের এ দিন শান দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ব্রিগেড ময়দানের সভা থেকে তিনি বলেন, তৃণমূল সরকারের একটাই লক্ষ্য, নিজেরা কাজ করবে না, করতেও দেবে না। কাটমানি না-মিললে কোনও প্রকল্পকে গ্রাম-বাংলায় পৌঁছতে দেয় না। তাই কেন্দ্রের প্রকল্পে বাধা দেয় এই সূত্রেই বিশ্বকর্মা যোজনা-সহ নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেছেন মোদী। এর সঙ্গেই বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাজ্যের কর্মসংস্থান নিয়েও সরব হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, নির্মম সরকার যুবক-যুবতীদের পালিয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিয়েছে। বাংলার যুবসমাজ পরিশ্রমী। কিন্তু এখন তাঁরা এখান থেকে না পাচ্ছেন ডিগ্রি, না হচ্ছে চাকরি। ভিনরাজ্যে যেতে হচ্ছে। প্রথমে কংগ্রেস, তার পর বাম এবং তৃণমূল, একে একে এসে পকেট ভরেছে। তৃণমূল সরকার প্রকাশ্যে চাকরি বিক্রি করেছে। বিজেপি সরকার এলে রাজ্যেই যুব সম্প্রদায় কাজ পাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মোদী।
রাজ্যে এই বছর আলুর অতিরিক্ত ফলন এবং তার পরেও রাজ্য সরকারের ‘উদাসীনতা’র জন্য চাষিরা দাম পাচ্ছেন না, এমন অভিযোগে ধারাবাহিক ভাবে সরব বিভিন্ন শিবির। এই প্রেক্ষিতে রাজ্যের আলু চাষিদের ‘দুর্দশা’ নিয়ে সরব হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও। ব্রিগেড ময়দানের সভা থেকে তিনি বলেন, বাংলার কৃষকের অবস্থাও শোচনীয়। সম্প্রতি চন্দ্রকোণায় আলু চাষি আত্মঘাতী হয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে হুগলি, বর্ধমান পর্যন্ত সমস্যা চলছে। সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতিই তৃণমূলের পরিচিতি। তৃণমূলের কাটমানি, কমিশনের জন্য চাষি থেকে মধ্যবিত্তের জীবন-জীবিকা নিয়ে খেলা করা হচ্ছে। নারী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজ্য সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশানা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ব্রিগেড ময়দানের সভা থেকে মোদী বলেছেন, সন্দেশখালি থেকে আর জি কর-কাণ্ড, বাংলার মানুষ ভোলেননি। তৃণমূল কী ভাবে প্রকাশ্যে অপরাধীদের সঙ্গে থাকে, সকলেই দেখেছে। মেয়েদের বলতে হয়, বাড়ি ফিরে এসো সন্ধ্যা নামার আগে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই পরিস্থিতি বদলে যাবে। এটাই মোদীর গ্যারান্টি। এ বার তৃণমূলকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। নতুন বাংলা গড়ার ডাক দিয়ে মোদী তৃণমূলের মা-মাটি-মানুষ স্লোগানকে কটাক্ষ করে বলেন, বাংলার মা নিঃস্ব, মাটি লুণ্ঠিত, মানুষ চলে যাচ্ছে! মা, বোনেদের বলছি, বিজেপি সরকার হলে নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এটা মোদীর গ্যারান্টি।
দুর্নীতি ইস্যুতে তৃণমূলকে নিশানা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। তিনি অভিযোগ করেন, চা-বাগানের শ্রমিকদেরও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা দিতে দেয় না তৃণমূল। পাকা বাড়ি সর্বত্র পাচ্ছেন মানুষ। কিন্তু এখানে প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। তার পরেও যাঁদের বাড়ি পাওয়ার কথা ছিল, তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। জলজীবন মিশন থেকে আয়ুষ্মান ভারত, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূলের জন্য বঞ্চিত বলে অভিযোগ মোদীর। তিনি বলেন, বাংলাকে অসুরক্ষিত করেছে সরকার। এখানে খোলাখুলি ধমক দেওয়া হচ্ছে যে একটি বিশেষ সম্প্রদায় আপনাদের খতম করে দেবে। সাংবিধানের কুর্সিতে বসে এমন কথা আপনার মুখে শোভা পায় না। ধমকানোই তৃণমূলের রাজনীতি। বাংলায় ভয়ের মহল বানিয়ে রাখা হচ্ছে, দুনিয়ার তা দেখা প্রয়োজন। এরা বলে তৃণমূলকে যে ভোট দেয় না, সেই বাঙালি-ই নয়! আমি তৃণমূলকে মনে করাচ্ছি, ওদের গুন্ডামির দিন এ বার শেষ হওয়ার মুখে। তৃণমূল সরকারের যাওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ার পরে সকলের উন্নয়ন হবে এক দিকে, অন্য দিকে সব কিছুর হিসাব হবে। তৃণমূলের গুন্ডারা যারা আপনাদের ভয় দেখায়, তাদের খারাপ দিন আসছে। আইনের শাসন হবে। অপরাধীদের একটাই জায়গা জেল। পাশাপাশি, অনুপ্রবেশের কথা বলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোষণের রাজনীতির অভিযোগ তুলেও সরব হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ভোট-রাজনীতির জন্য তৃণমূলই বাধা দিয়েছিল বলে অভিযোগ তুলেছেন মোদী। পাশাপাশি, ভোট ব্যাঙ্কের স্বার্থেই মৃতদের নামও তৃণমূল ভোটার তালিকায় রাখতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
আসন্ন ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে সরব হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই প্রেক্ষিতে তৃণমূলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ব্রিগেড ময়দানের সভা থেকে মোদী বলেছেন, যখনই কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের চেষ্টা করে, তখনই তৃণমূল হামলা করে। যারা নিরপেক্ষ, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তৃণমূল। এও বলেন, ওঁরা শুধু রাষ্ট্রপতিকে অপমান করেননি। ওঁরা আদিবাসীদের অপমান করেছেন। কোটি কোটি মহিলাকে অপমান করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ পদের গরিমাকে খাটো করেছেন। ওঁরা সংবিধানের অপমান করেছেন। বাবাসাহেব আম্বেদকরকে অপমান করেছেন। এর সাজা নির্মম সরকার পাবে।

