টানা দু’বছর খেলরত্নে  নাম নেই কোন  ক্রিকেটারের

২০২৫ সাল ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য সাফল্যে ভরা এক উজ্জ্বল অধ্যায়। পুরুষ ক্রিকেট দল চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জয় করে আবারও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আধিপত্য প্রমাণ করেছে। অন্যদিকে, মহিলা ক্রিকেট দল প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করে ইতিহাস রচনা করেছে, যা ভারতীয় ক্রিকেটের সামগ্রিক অগ্রগতিকে আরও দৃঢ় করেছে। এত সাফল্যের পরও জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের মঞ্চে ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময়, হতাশা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ বছর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারের জন্য কোনও ক্রিকেটারের নাম প্রস্তাব করা হয়নি। ফলে খেলরত্ন বা অর্জুন পুরস্কারের মনোনীত তালিকায় একটিও ক্রিকেটারের নাম নেই। খবর ছিল, খেলরত্নের জন্য হরমনপ্রীত সিং ও স্মৃতি মন্ধানার নাম বিবেচিত হয়েছিল। দীর্ঘ আলোচনাও হয়েছিল তাঁদের নিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গগন নারাং, অপর্ণা পোপাট ও এমএম সোমায়ারের কমিটি তাঁদের নাম অনুমোদন করেনি। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ক্রিকেটে নির্দিষ্ট পয়েন্ট-ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং বোর্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও নাম পাঠানো না।
এই ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালেও বিসিসিআই থেকে কোনও ক্রিকেটারের নাম সুপারিশ করা হয়নি। ফলে গতবারও জাতীয় ক্রীড়া দিবসে কোনও ক্রিকেটার পুরস্কার পাননি। শেষবার ২০২৩ সালে মহম্মদ শামি অর্জুন পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার আগে শচীন তেণ্ডুলকর, এমএস ধোনি, বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মার মতো কিংবদন্তিরা খেলরত্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বহু ক্রিকেটার অর্জুন পুরস্কারও পেয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু শেষ দু’বছর ধরে এই ধারা বন্ধ—কেন, তা স্পষ্ট নয়। বোর্ডের নীরব অবস্থান পুরো বিষয়টিকে রহস্যাবৃত করে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রিকেট একটি দলগত খেলা হলেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের নির্দিষ্ট কাঠামো থাকলে পুরস্কার মনোনয়নে স্বচ্ছতা ও যুক্তি আরও দৃঢ় হতো। অলিম্পিক বা কমনওয়েলথ-নির্ভর খেলাগুলিতে পদক, র‍্যাঙ্কিং, পারফরম্যান্স সূচক ইত্যাদির ভিত্তিতে পয়েন্ট-ভিত্তিক মনোনয়ন সহজ হয়। কিন্তু ক্রিকেটে এই কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত না থাকায় কমিটির কাছে তুলনামূলক বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর বিসিসিআই যেহেতু নিজে থেকে নাম পাঠাচ্ছে না, তাই কমিটি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ক্রিকেটারদের তালিকায় রাখতেও আগ্রহী হচ্ছে না।
এদিকে, ২০২৫ সালের অর্জুন পুরস্কারের তালিকায় মোট ২৪ জন ভারতীয় ক্রীড়াবিদ মনোনীত হয়েছেন, যার মধ্যে তিনজন বাঙালি—প্রণতি নায়েক (জিমন্যাস্টিক), মেহুলি ঘোষ (শুটিং) এবং সুতীর্থা মুখোপাধ্যায় (টেবিল টেনিস)। ব্যাডমিন্টনে প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছেন পুল্লেলা গোপীচাঁদের কন্যা গায়ত্রী গোপীচাঁদ। যোগাসন বিভাগে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পাঁচ বছর পর অর্জুন পুরস্কারের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে আরতি পালের নাম। এই মনোনয়নগুলি দেখিয়ে দেয়, অন্যান্য খেলাগুলিতে স্বীকৃতি, কাঠামো ও ধারাবাহিক সুপারিশের ভিত্তিতে পুরস্কারপ্রাপ্তির পথ ক্রমশ শক্তিশালী ও সংগঠিত হচ্ছে।
ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে এই অনুপস্থিতি শুধু সম্মানহানির বিষয় নয়, এটি তাঁদের মনোবল ও জাতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে ক্রিকেটের স্বীকৃতি নিয়েও বৃহত্তর প্রশ্ন তোলে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার তারকারা যখন পুরস্কারের মঞ্চে জায়গা পান না, তখন সেটি দেশের ক্রীড়াব্যবস্থার ভারসাম্য ও মূল্যায়ন কাঠামোর দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
সুতরাং, বোর্ড ও ক্রীড়ামন্ত্রক—দু’পক্ষকেই এই সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। ক্রিকেটে একটি নির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পয়েন্ট সিস্টেম চালু করা এবং বিসিসিআইয়ের নিয়মিত সুপারিশ পাঠানো অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে, সাফল্য থাকলেও সম্মানপ্রাপ্তির মঞ্চে ক্রিকেটারদের বারবার বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে, যা ভারতীয় ক্রিকেটের অগ্রগতির সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + 5 =