সব্যসাচী বাগচী
নিউজিল্যান্ড ফাইনালে যাওয়ার পথে দ্রুত এগোনোর সময়, তিন জনের মুখ যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল। প্রথমজন সূর্য কুমার যাদব। দ্বিতীয় গৌতম গম্ভীর। তৃতীয় ব্যক্তি হ্যারি ব্রুক। টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ক ও কোচের মাথায় শুধু তারকা খচিত ইংল্যান্ড ঘুরপাক খাচ্ছে না। বরং এখন থেকেই নিউজিল্যান্ড নামক এক ভয়ংকর দল ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ, নিউজিল্যান্ড সুধু ৯ উইকেটে হারিয়ে চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে চলে গেল না। ভারত ও ইংল্যান্ডকে একটা স্টেটমেন্ট দিয়ে গেল। যেন বলে দিয়ে গেল, ‘আমাদের থেকে কিন্তু খুব সাবধান!
চোকার্স তকমাটা মুছতে পারল না দক্ষিণ আফ্রিকা। এত দিন অপরাজিত থাকা এইডেন মার্করামেরা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেন সেমিফাইনালে। এই প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কিউয়িদের কাছে হারল প্রোটিয়ারা। নিউজিল্যান্ড জয় পেল ৯ উইকেটে। কিউয়িদের জয় এল কলকাতা নাইট রাইডার্সের দুই ব্যাটারের দাপটে। ৩৩ বলে ১০০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে কলকাতার ক্রিকেটপ্রেমীদের বার্তা দিয়ে রাখলেন ফিন অ্যালেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ৮ উইকেটে ১৬৯ রানের জবাবে ১২.৫ ওভারে ১ উইকেটে ১৭৩ রান তুলে বিশ্বকাপের ফাইনালে চলে গেল কিউয়িরা।
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯টা বেজে ৩৬ মিনিট। কাগিসো রাবাদা দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য যেন ভগবান হিসেবে আবির্ভূত হলেন। ৩৩ বলে ৫৮ রানের ঝড় তুলে তখন সাজঘরে ফিরে যাচ্ছেন টিম সাইফার্ট । তবে প্রোটিয়ারা সাফল্য পেলেও, আইডেন মার্করামের চোখ-মুখ তখন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে! কারণ পাওয়ার প্লে-তে ৮৪ রান তুলে ‘কাম তামাম’ করে দিয়েছে নিউজিল্যান্ডের দুই ওপেনার। তাই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার কিউইদের ফাইনালে যাওয়া যে শুধু সময়ের অপেক্ষা।
২০ ওভারে ১৭০ রান চেজ করা আধুনিক মারকাটারি ক্রিকেট যুগে কিউইদের ব্যাটিং লাইনআপের জন্য জলভাত! যদি না কোনও অঘটন ঘটে। প্রায় ৪০ হাজারের ইডেনে এই রাতে দুই কিউই ওপেনার কোনও চান্স দেননি। সেইফার্ট আউট হলেও, ফিন অ্যালেন ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বিপক্ষের বোলারদের কচুকাটা করলেন।
প্রথম উইকেটের জুটিতে ৯.১ ওভারে ১১৭ রান তোলেন। সেইফার্ট ৩৩ বলে ৫৮ রান করেন। ৭টি চার এবং ২টি ছয় এসেছে তাঁর ব্যাট থেকে। কলকাতা নাইট রাইডার্সের দুই ক্রিকেটারের দাপটে ইডেন গার্ডেন্সে কোণঠাসা হয়ে পড়েন মার্করামেরা। সেইফার্ট আউট হওয়ার পর অ্যালেনের সঙ্গে যোগ দেন কেকেআরের আর এক ক্রিকেটার রাচিন রবীন্দ্র। অ্যালেন ম্যাচের শেষ পর্যন্ত ২২ গজের এক প্রান্ত আগলে রাখেন। ১০টি চার এবং ৮টি ছয়ের সাহায্যে ৩৩ বলে শতরান করলেন। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তৃতীয় দ্রুততম শতরানের নজিরও গড়লেন।
ইডেনের শিশির ভেজা মাঠে প্রোটিয়াদের খাড়া টার্গেটকে সহজ থেকে সামান্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনলেন দুই কিউয়ি ওপেনার টিম সাইফার্ট এবং ফিন অ্যালেন। বিপক্ষে থাকা কাগিসো রাবাডা, লুনগি এনগিডিদের নিয়ে স্রেফ ছেলেখেলা করলেন তাঁরা ইডেনের বাইশ গজে দাঁড়িয়ে। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই বাউন্ডারি মারেন সাইফার্ট। প্রথম ছয় ওভার শেষেই লেখা হয়ে যায় ম্যাচের ভাগ্য। ধ্বংসলীলা চালিয়ে সেঞ্চুরি পূরণ করলেন ফিন অ্যালেন। ৪৩ বল বাকি থাকতে ফাইনালে কিউয়িরা।
টস জিতে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেন কিউয়ি অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। ইনিংসের শুরুটা ভাল হয়নি দক্ষিণ আফ্রিকার। দ্বিতীয় ওভারে পর পর দু’বলে কুইন্টন ডি কক (১০) এবং রায়ান রিকেলটনকে (০) আউট করে প্রোটিয়াদের চাপে ফেলে দেন কোল ম্যাককোনচি। মার্করামকে (১৮) বিতর্কিত ক্যাচ আউট দিয়ে সমস্যা বাড়িয়ে দেন তৃতীয় আম্পায়ার নীতিন মেননও। তবে রাচিন রবীন্দ্র, গ্লেন ফিলিপসেরা সহজ ক্যাচ ফেলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিলেন।
বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে বিতর্ক তৈরি হল আম্পায়ারিং নিয়ে। ঘটনাটি দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের অষ্টম ওভারের। রাচিন রবীন্দ্রের বলে ছয় মারার চেষ্টা করেন মার্করাম। কিন্তু তাঁর টাইমিং ঠিক হয়নি। লং অনে ফিল্ডার ছিলেন ডারেল মিচেল। তিনি খানিকটা এগিয়ে এসে সামনে ঝাঁপিয়ে ক্যাচ ধরার চেষ্টা করেন। মাঠের আম্পায়ার সিদ্ধান্ত না নিয়ে তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে পাঠিয়ে দেন। কয়েক বার রিপ্লে দেখে মার্করামকে (২০ বলে ১৮) আউট দেন মেনন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কারণ রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা গিয়েছে, মিচেল তালুবন্দি করার আগে বল সামান্য লাফায়। বল মাটিতে পড়ে লাফিয়েছিল না মিচেলের আঙুলে পড়ে লাফিয়েছিল, তা টেলিভিশন রিপ্লেতে নিশ্চিত ভাবে বোঝা যায়নি। নিশ্চিত হতে পারেননি ধারাভাষ্যকারেরাও। তবে মেনন জানিয়ে দেন, বলের তলায় মিচেলের আঙুল ছিল। তাই মার্করাম আউট।
ডেভিড মিলার (৬) দলকে ভরসা দিতে পারেননি। এক সময় ৭৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বেশ চাপে পড়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকা। তবু গত বারের রানার্সদের লড়াই করার মতো জায়গায় পৌঁছে দিলেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস, ট্রিস্টান স্টাবস, জানসেনেরা। ব্রভিস চার নম্বরে নেমে করেন ২৭ বলে ৩৪। মারেন ৩টি চার এবং ২টি ছয়। স্টাবস করলেন ২৪ বলে ২৯। ২টি চার, ১টি ছক্কা মারেন তিনি। মূলত জানসেনের অর্ধশতরানই নিউজিল্যান্ডকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল। ঠান্ডা মাথায় ৩০ বলে ৫৫ রানের অপরাজিত ইনিংস খেললেন জানসেন। তাঁর ব্যাটেই জান ফিরল দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের। মারলেন ২টি চার এবং ৫টি ছক্কা।
নিউ জ়িল্যান্ডের রাচিন ২৯ রানে ২ উইকেট নিলেন। ৯ রানে ২ উইকেট ম্যাককোনচির। ৩৪ রানে ২ উইকেট ম্যাট হেনরির। ২৯ রান দিয়ে ১ উইকেট লকি ফার্গুসনের। এ ছাড়া ৪২ রানে ১ উইকেট জেমস নিশামের। স্যান্টনার ভাল বল করলেও উইকেট পেলেন না। তবে এতে খুব ক্ষতি তো হল না। কারণ, বুধবারের রাতে তাঁর দুই ওপেনার যে দখিণ আফ্রিকাকে উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্নে বুঁদ ছিলেন।

