কলকাতায় বাড়ছে মানসিক উদ্বেগ ও দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস: এমপাওয়ার-এর রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য

কলকাতা : কলকাতার দ্রুত পরিবর্তনশীল নাগরিক জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন আর কেবল দৃশ্যমান কোনো সংকটে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা, অবসাদ এবং দৈনন্দিন কাজকর্মের সমস্যার মধ্য দিয়ে প্রকট হয়ে উঠছে। আদিত্য বিড়লা এডুকেশন ট্রাস্টের একটি উদ্যোগ ‘এমপাওয়ার’ (Mpower)-এর অভ্যন্তরীণ তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর প্রবণতা দেখা গেছে। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন শ্রীমতি নীর্জা বিড়লার নেতৃত্বে পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, শহরের বাসিন্দারা এখন মেজাজ হারানো, উদ্বেগ, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যার জন্য ক্রমবর্ধমান হারে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে এমপাওয়ারের এই ফলাফল মিলে যাচ্ছে, যা নির্দেশ করে যে রাজ্যে উদ্বেগ (anxiety), বিষণ্ণতা (depression) এবং মানসিক চাপজনিত সমস্যার বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, কলকাতার মতো ঘিঞ্জি শহুরে পরিবেশে পড়াশোনা ও কাজের চাপ, আর্থিক দায়িত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকীত্ব এবং ঘুমের অভাবের মতো প্রাত্যহিক সমস্যাগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণার রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।

কলকাতার ‘এমপাওয়ার সেন্টার’-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্রধান ডাঃ প্রীতি পারেখ বলেন, “আমরা দেখছি অনেক মানুষই সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের তকমা নিয়ে আমাদের কাছে আসছেন না। তারা আসছেন ক্লান্তি, মানসিক ভারাক্রান্ততা, খিটখিটে মেজাজ এবং অতিরিক্ত চাপের অনুভূতি নিয়ে। অনেক সময় তারা বুঝতে পারেন না একে কী বলা উচিত, তবে তারা এটুকু বোঝেন যে আগে যেভাবে তারা পরিস্থিতি সামলাতেন, এখন আর তা পারছেন না।”

এমপাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব ভারতে (কলকাতা সহ) সংস্থাটির বিভিন্ন ক্লিনিকাল পরিষেবা, হেল্পলাইন এবং সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে ১.৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ উপকৃত হয়েছেন। এর মধ্যে কিশোর-কিশোরী (০-১৭ বছর), তরুণ প্রজন্ম (১৮-২৫ বছর) এবং কর্মজীবী মানুষের (২৬-৪৯ বছর) সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এই উপাত্ত প্রমাণ করে যে, একদম প্রাথমিক স্তরেই মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া এবং সচেতনতা তৈরি করা কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন যে, সামাজিক কলঙ্ক বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই পেশাদার সাহায্য নিতে দেরি করেন। এই বাধা কাটাতে এমপাওয়ার সম্প্রতি কলকাতায় একটি ‘আর্ট থেরাপি’ বা শিল্পকলা ভিত্তিক কর্মশালার আয়োজন করেছিল। এটি মূলত এমন একটি মাধ্যম যেখানে কথা না বলেও সৃজনশীলতার সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। যারা সরাসরি কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাদের জন্য এই থেরাপি মানসিক চাপ কমাতে এবং আত্মসচেতনতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর।

এমপাওয়ার গত ১০ বছর ধরে ভারতে সুলভ ও উন্নতমানের মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে আসছে। সংস্থাটির মতে, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয়তা যেমন বাড়ছে, তেমনই একে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য এবং সামাজিক জড়তামুক্ত করে তোলা প্রয়োজন।

এক নজরে এমপাওয়ার (Mpower)

আদিত্য বিড়লা এডুকেশন ট্রাস্টের একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে এমপাওয়ার গত এক দশক ধরে ভারতের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতায় কাজ করছে। মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, দিল্লি সহ সাতটি শহরে ২০০-র বেশি প্রশিক্ষিত পেশাদার নিয়ে সংস্থাটি কাজ করে চলেছে।

এদের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, কর্পোরেট এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা। ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইনের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে যৌথভাবে কাজ করে একটি কলঙ্কমুক্ত সমাজ গড়াই এমপাওয়ার-এর লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 7 =