#eci
#poll
#result
#election
#ceo
কলকাতা: গঙ্গার পাড়ে কি এবার ডাল লেকের সেই চেনা মেজাজ? গত কয়েকদিন ধরে তিলোত্তমার রাস্তায় নীল-সাদা পুলিশের গাড়ির ভিড়ে নজর কাড়ছে ঘিয়ে রঙের এক ইস্পাত-কঠিন অবয়ব। অযোধ্যার রামমন্দিরে নিরাপত্তার ‘কবচ’ হয়ে থাকার পর, জম্মু-কাশ্মীরের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সেই বিশেষ সাঁজোয়া বাহিনী এবার পা রেখেছে খাস কলকাতায়। লক্ষ্য— মহানগরীর নিরাপত্তা বলয়কে নিশ্ছিদ্র করা।
এই বিশেষ গাড়িটির পোশাকি নাম ‘মহিন্দ্রা মার্কসম্যান’। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কাছে যা অজেয়। গ্রেনেড হামলা থেকে রকেট লঞ্চার, এমনকি অতর্কিত পাথরবৃষ্টি— সবটা সামলে নিয়ে ভেতরের জওয়ানদের ‘মায়ের আঁচলের’ মতো আগলে রাখাই এর কাজ। বাহিনীর এক সদস্যের কথায়, “এই গাড়ি শুধু লোহার চাদর নয়, আমাদের জওয়ানদের কাছে এটা জীবনদায়ী কবচ। যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতেও এর ভেতর আমরা সুরক্ষিত।”
অযোধ্যা থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এই সাঁজোয়া যান যখন কলকাতার নিউটাউন এলাকায় প্রবেশ করল, তখন কৌতূহলী মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। রামলালার মন্দিরে এই বাহিনীর জওয়ানরা রীতিমতো পুজো সেরে তবেই যাত্রার সূচনা করেছিলেন। সেই আশীর্বাদ মাথায় নিয়েই এবার বাংলার অলিগলি চিনছে এই ‘মার্কসম্যান’। নদীর পাড় ধরে বা শহরের ব্যস্ত মোড়ে যখন এই গাড়িটি দাঁড়াচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের চোখেমুখে বিস্ময় আর ভরসার মিশ্রণ।
মহিন্দ্রা মার্কসম্যান হলো ভারতের প্রথম ক্যাপসুল-ভিত্তিক হালকা সাঁজোয়া যান, যা মূলত প্রতিরক্ষা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর প্রধান বিশেষত্বগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
বিস্ময়কর সুরক্ষা ক্ষমতা: এই গাড়িটি বি৬ স্তরের ব্যালিস্টিক সুরক্ষা প্রদান করে। এটি ৭.৬২ মিমি রাইফলের গুলি এমনকি একে-৪৭-এর মতো শক্তিশালী অস্ত্রের আঘাতও সইতে সক্ষম।
বিস্ফোরণ প্রতিরোধ: এর মেঝের গঠন এমনভাবে তৈরি যে নিচে একসাথে দু’টি ডিএম-৫১ গ্রেনেড ফাটলেও ভেতরে থাকা জওয়ানদের কোনো ক্ষতি হয় না।
অস্ত্র ও নজরদারি: গাড়ির উপরে একটি বিশেষ মাউন্ট রয়েছে যেখানে মেশিনগান বসানো যায়। এছাড়া চারপাশ পর্যবেক্ষণ করার জন্য এতে রিমোট কন্ট্রোল সার্চ লাইট এবং পেছনের এলাকা দেখার জন্য ক্যামেরা ও এলসিডি স্ক্রিন রয়েছে।
ফাইটিং পোর্টস: জওয়ানদের গাড়ি থেকে নামার প্রয়োজন পড়ে না; গাড়ির ভেতরে বসেই সাতটি বিশেষ ছিদ্র বা ‘ফায়ারিং পোর্ট’ দিয়ে তারা বাইরে শত্রুর দিকে গুলি চালাতে পারেন।
ইঞ্জিন ও ক্ষমতা: এতে ২.২ লিটার এম-হক বা ২.৬ লিটার ডিজেল ইঞ্জিন থাকে। ৪-হুইল ড্রাইভ হওয়ায় এটি পাহাড়ি বা পাথুরে রাস্তায় সহজেই চলতে পারে এবং ঘণ্টায় ১২০ কিমি গতিবেগ তুলতে পারে।
ধারণক্ষমতা: এই সাঁজোয়া যানে চালক ও সহ-চালকসহ মোট ৬ জন জওয়ান বসতে পারেন।
টায়ার সুরক্ষা: এর টায়ারে ‘রান-ফ্ল্যাট’ (Run-flat) সিস্টেম রয়েছে, যার ফলে টায়ার ফেটে গেলেও গাড়িটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত সচল থাকে।
সহজ কথায়, মহিন্দ্রা মার্কসম্যান হলো চলন্ত একটি দুর্গ, যা প্রতিকূল পরিবেশে জওয়ানদের জীবন রক্ষা করতে এবং শত্রুর মোকাবিলা করতে পারদর্শী।
এক প্রত্যক্ষদর্শীর সরস মন্তব্য, “কাশ্মীরের টিভিতে যে গাড়িগুলো দেখতাম, সেগুলো এখন ঘরের দুয়ারে। দেখলেই বোঝা যায়, এর সামনে কোনও ফন্দি খাটবে না।”
কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিউটাউন থেকে শহরের হৃদপিণ্ডে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে এই আধুনিক যান। প্রযুক্তি আর রণকৌশলের এক নিখুঁত মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই সাঁজোয়া বাহিনী এখন কলকাতার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। যারা অশান্তি ছড়াতে চায়, তাদের জন্য এই গাড়িটি যেমন ভয়ের কারণ, তেমনই সাধারণ মানুষের জন্য এটি উৎসবের আমেজে এক বাড়তি নিরাপত্তা। কাশ্মীর থেকে অযোধ্যা হয়ে গঙ্গার তীরে এই ইস্পাত-মানবের আগমন আগামীর দিনগুলোতে বাংলার নিরাপত্তা মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।

