সব্যসাচী বাগচী
২৫ জুন ১৯৮৩। মদন লালের শর্ট বলকে হুক করতে গেলেন ভিভ রিচার্ডস। টাইমিং ঠিক হল না। ডিপ স্কোয়ার লেগের দিকে প্রায় ২৫ গজ দৌড়ে ক্যাচটা লুফেছিলেন অধিনায়ক কপিল দেব। সেই ক্যাচের সুবাদে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারত। আর এবার এমনই দুটি ক্যাচ ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে অনেকটা সাহায্য করল! জেকব বেথেল শতরান করে ভারতের কাঁপুনি ধরালেও লাভ হল না। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে মাত্র ৭ রানে জিতে মেগা ফাইনালে চলে গেল টিম ইন্ডিয়া। যদিও বোলিং ও ব্যাটিং নিয়ে রেখে গেল একাধিক প্রশ্ন।
৪৩ বছর পর যেন দেখা গেল সেই ক্যাচের রিমেক। তফাৎ ফরম্যাট, বলের রঙ, ভেন্যু এবং বিপক্ষ দল বদলে গিয়েছে। এবার কপিল দেবের মতোই কঠিন কাজটা অতি সহজে করে দেখালেন অক্ষর প্যাটেল। জসপ্রীত বুমরাহ সবেমাত্র হাতে বল নিয়েছেন। তাঁর প্রথম বলেই মারতে গেলেন হ্যারি ব্রুক। টাইমিং ঠিক হল না। বল গেল আকাশের দিকে। ক্যামেরা ধরল অক্ষরকে। তিনিও কপিলের মতো উল্টোদিকেই দৌড়ে যাচ্ছেন। দুই চোখ বলে দিকে। এবং শেষ পর্যন্ত ক্যাচ। হ্যারি ব্রুক আউট।
ইংল্যান্ডের ডু অর ডাই পরিস্থিতি। ওরা তো শুরু থেকেই চালিয়ে খেলবে। সেটাই তো স্বাভাবিক। ভারতের বোলাররাও বুঝিয়ে দিল, ‘তোমরা যতই মারো। শেষ হাসি আমরাই হাসব।‘ বরুণ চক্রবর্তী (৪-০-৬৪-১) অর্শদীপ সিংরা (৪-০-৫১-১) যতই রান দেন, জসপ্রীত বুমরাহ (৪-০-৩৩-১) তো আছেন। তিনি সূর্য কুমার যাদবের কাছে এবারও ত্রাতা হিসেবে দেখা দিলেন। নাহলে ৯৫ রানে ৪ উইকেট চলে যাওয়ার পরেও জ্যাকব বেথেল ও উইল জ্যাকসের রান তোলা দেখে মনে হচ্ছিল, ম্যাচ রিপোর্ট আগাগোড়া না বদলে ফেলতে হয়। তেমনটা হয়নি। কারণ আবার দুরন্ত ক্যাচ ধরলেন অক্ষর। অর্শদীপ নাগাড়ে ওয়াইড করে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর এমনই অফ স্টাম্পের বাইরে যাওয়া বলকে এক্সট্রা কভারে উপর দিয়ে গ্যালারিতে ফেলতে চেয়েছিলেন ফিল জ্যাকস। কিন্তু প্রায় ১৫ মিটার দৌড়ে এসে প্রায় ছক্কা হতে চলা বলকে লুফেই পাশে থাকা শিবম দুবের হাতে ছুড়ে দিলেন। জ্যাকস আউট হতেই স্বস্তি পেল ভারতীয় দল।
তবে জ্যাকব বেথেল হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। এবার স্যাম কারেনকে নিয়ে লড়াই চালালেন। রেকর্ড রান চেজ করতে নেমে দুরন্ত শতরানও করলেন জ্যাকব বেথেল (৪৮ বলে ১০৫)। কিন্তু লাভ হল না। হার্দিক তাঁকে রান আউট করতেই ভারতের জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।
হয়তো ক্রিকেট দেবতাও ভারতকেই ফাইনালে দেখতে চেয়েছিলেন। না হলে যে সঞ্জু ‘দৈত্য’ স্যামসনের ব্যাটিং ঝড় যে আরব সাগরে মিশে যেত!সঞ্জু হলেন দ্বিতীয় গ্রহের লড়াকু মানুষ। মধ্যবৃত্ত সম্প্রদায়ের। যারা একটা সময় পর্যন্ত মার খাবে। কিন্তু ব্যাপারটা চরমে উঠলে পাল্টা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না! শুধু তো ‘দৈত্য’ স্যামসনের ঝড় নয়। বাকিরাও ইংল্যান্ডকে নিয়ে ছেলেখেলা করল। ফলে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৫৩ রান তুলতে ভারতকে বেগ পেতে হল না।
ইডেন গার্ডেন্সের পর এবার ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর এবার ইংল্যান্ড। সঞ্জু স্যামসন কোন আতঙ্কের নাম সেটা বিপক্ষ দল খুব বুঝে গিয়েছে। ভার্চুয়াল কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে মাত্র ৫০ বলে অপরাজিত ৯৭। বৃহস্পতিবার আরব সাগরের তীরের মুম্বইতে ঠিক যেন সেখান থেকেই শুরু করেছিলেন। এবার হাতে অনেকটা সময় ছিল। অনায়াসে নিজের কেরিয়ারের কথা ভেবে ধীরেসুস্থে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে তাঁর চতুর্থ শতরান সেরে ফেলতেই পারতেন।
কিন্তু না, সঞ্জু যে মধ্যবিত্ত। তিনি যে রাহুল দ্রাবিড়ের ছাত্র। রোহিত শর্মা তাঁর আইডল। তাই তাঁর কাছে ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, সবার আগে দল। তাই তো নিজের দিকটা না ভেবেই ১৪তম ওভারের প্রথম বলটাই ফিল জ্যাকসকে তুলে মারতে গেলেন। তবে এবার বল গ্যালারি পর্যন্ত গেল না। ফিল সল্ট ক্যাচ ধরতেই ৪২ বলে ৮৯ রানে থামলেন সঞ্জু। ২১১.৯০ স্ট্রাইক রেট বজায় রেখে গড়া এই দাপুটে ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও সাতটি ছক্কা। তাই গাড়ওয়াড়ে প্যাভিলিয়নের দিকে ফেরার সময় শুধু সতীর্থ ও সাপোর্ট স্টাফরা স্টান্ডিং ওভেশন দিল না, গোটা ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের গ্যালারি উঠে দাঁড়াল।
২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে ৫ মার্চ ২০২৬। এক বছর এক মাস তিন দিনের ব্যবধানে অভিষেক শর্মার কেরিয়ারে এমন পতন নেমে আসবে কেউ ভাবতেও পারেনি! সেই রাতেও এই ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অভিষেক নেমেছিলেন। প্রতিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। টিম ইন্ডিয়ার ওপেনার ছিলেন রুদ্র মেজাজে। মাত্র ৫৪ বলে করেছিলেন টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে নিজের সর্বোচ্চ ১৩৫ রান করেছিলেন অভিষেক। এবারও সেই একই প্রতিপক্ষ। ভেন্যু সেই ওয়াংখেড়ে। তবে সময়ের সঙ্গে অভিষেকও বদলে গিয়েছেন। ‘স্লগার’ হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়াতে ট্রোল হওয়া অভিষেক আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন। নিজের উইকেটের মূল্য বোঝেন না। অহেতুক ব্যাট চালাতে গিয়ে দলকে ফেলেন সমস্যায়।
যদিও শুধু সঞ্জু নন। ঈশান কিশানের কথাও বলতে হবে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে খেলার সুবাদে এই পিচ ও মাঠকে খুব ভালভাবে জানেন ঈশান। তিনিও আক্রমণ করলেন। ১৮ বলে ৩৯ রানে আদিল রাশিদের বলে আউট হওয়ার আগে ইংরেজদের চাপে রেখেছিলেন।
চার নম্বরে ব্যাট করতে এসে শিভম দুবেও নিজের হোম গ্রাউন্ডে আরও একবার বোঝালেন কেন টিম ম্যানেজমেন্ট কুলদীপ যাদবের মতো ম্যাচ উইনারকে ম্যাচের পর ম্যাচ বসিয়ে তাঁকে খেলাচ্ছে। এবারের কাপ যুদ্ধে একাধিক মারকুটে ইনিংস খেলেছেন শিবম। সেমি ফাইনালের এই বিস্ফোরক ইনিংস ছিল অনবদ্য। তবে ২৫ বলে ৪৩ রানে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে রান আউট না হলে, এই ইনিংস আরও বড় হতেই পারত। হার্দিক পান্ডিয়ার ভুলের খেসারত দিতে হল শিবমকে।
শিবম ফিরলেও, শেষ বেলায় জফ্রা আর্চারকে নিয়ে ছেলেখেলা করলেন তিলক ভার্মা। ৭ বলে ২১ রানে ফেরার সময় আর্চারকেই তিনটি ছক্কা মারলেন। শেষ ওভারে আগুন ঝরালেন হার্দিক। তিনিও রান আউট হলেন। তবে আউট হওয়ার আগে হার্দিকের ব্যাট থেকে এল ১২ বলে ২৭ রান। ফলে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৫৩ রান তুলে দিল ভারত। যা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহসে সর্বোচ্চ রান।
বাকি কাজটা বুমরাহের স্পেশাল স্কিল, অনেক বছর পর্যন্ত মনে রাখার মতো অক্ষরের দুটি ক্যাচ। সঙ্গে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠার আগেই টম ব্যান্টনের উইকেট। ফলে দুই ইংরেজ ব্যাটার চোখে চোখ রেখে লড়াই করলেও, সাহেবদের খালি হাতে ফিরতে হল। কারণ স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল, ইংল্যান্ড ২৪৬ রানে ৭ উইকেট! অর্থাৎ মাত্র ৭ রানে জিতল ভারত!
এবার কাপ যুদ্ধের লড়াই। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালের মতো এবারও কি নিউজিল্যান্ড উড়ে যাবে? নাকি মিচেল সেন্টনারের দুই ওপেনার ফিন অ্যালেন ও টিম সেইফার্ট আবার ঝড় তোলার অপেক্ষায় রয়েছেন? আহমেদাবাদে কার জন্য একগাল হাসি অপেক্ষা করছে, সেটা তো সময় বলবে।
তবে ফাইনালের আগে কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে রোগ ভারতকে সারাতেই হবে।
এক) অভিষেক শর্মাকে কি এখনও বয়ে বেড়াবে?
দুই) সুপার এইট থেকে সেমি ফাইনাল, বরুণ চক্রবর্তীর এত খারাপ বোলিংয়ের কারণ?
তিন) অধিনায়ক সূর্য কুমার যাদব আর কবে নক-আউট ম্যাচে রান করবেন?

