গ্রুপ পর্বে দুরন্ত, নকআউটে নিষ্প্রভ—এই বৈপরীত্যই যেন গত কয়েক বছরে বাংলার ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রনজি ট্রফি, বিজয় হাজারে ট্রফি কিংবা সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি—প্রতিটি টুর্নামেন্টেই শুরুটা হয় আশাব্যঞ্জক। পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষে থাকা, বড় ব্যবধানে জয়, বোলারদের ধারালো পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে সমর্থকদের মনে তৈরি হয় নতুন স্বপ্ন। কিন্তু নকআউট পর্ব এলেই যেন বদলে যায় চিত্রনাট্য। আত্মবিশ্বাসী দলটাই হয়ে পড়ে স্নায়ুচাপে জর্জরিত।
এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটল না। জম্মু-কাশ্মীরের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে হারের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলা। অথচ এবারের রনজিতে সর্বাধিক পয়েন্ট পেয়েছিল তারাই। ঘরের মাঠে নকআউট ম্যাচ খেলার সুবিধাও ছিল। উপরন্তু জাতীয় দলের তিন পেসার—মহম্মদ শামি, মুকেশ কুমার ও আকাশ দীপ—বাংলার জার্সিতে খেলছিলেন। তাঁদের গতি ও অভিজ্ঞতা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলবে, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন ছবি।
কাশ্মীরের তরুণ পেসার আকিব নবিই ম্যাচের রং বদলে দিলেন। গোটা ম্যাচে ৯ উইকেট তুলে তিনি বাংলার ব্যাটিংকে ছিন্নভিন্ন করে দেন। সেখানে আকাশ-মুকেশরা প্রত্যাশামতো প্রভাব ফেলতে পারেননি। লড়েছেন একমাত্র শামি। কিন্তু একা একজন বোলার দিয়ে তো ম্যাচ জেতা যায় না, বিশেষ করে যখন ব্যাটিং বারবার ভেঙে পড়ে।
এই ব্যর্থতার কেন্দ্রে উঠে আসছে অধিনায়ক অভিমন্যু ঈশ্বরণের নাম। জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। কিন্তু নকআউট পর্বে তাঁর পরিসংখ্যান হতাশাজনক। গত সাত বছরে নকআউটে ১১টি ইনিংস খেলেও একবারও পঞ্চাশ ছুঁতে পারেননি। অধিকাংশ রান এসেছে লিগ পর্বে। বড় ম্যাচে বড় ইনিংস না এলে নেতৃত্বের দায় এড়ানো যায় না। এ ম্যাচেও তিনি মাত্র ৫ রানে আউট। ক্রিকেটমহলের মতে, তাঁর একটি কার্যকরী ইনিংসই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারত।
শুধু অভিমন্যু নন, দায় রয়েছে অভিজ্ঞ ব্যাটারদেরও। যে দল কোয়ার্টার ফাইনালে ৬০০ রান তোলে এবং সেমিফাইনালের প্রথম ইনিংসে ৩২৮ রান করে, তারা কীভাবে দ্বিতীয় ইনিংসে একশোর গণ্ডিও পেরতে পারে না? লাল বলের ক্রিকেটে দ্বিতীয় ইনিংসই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। সেখানে এমন ধস মানতে পারছেন না বিশ্লেষকরা। জম্মু-কাশ্মীরের মতো তুলনামূলক অনভিজ্ঞ দলের বিরুদ্ধে এই ব্যাটিং বিপর্যয় প্রশ্ন তুলছে দলের মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে।
তৃতীয় দিনের শেষে স্কোরবোর্ড বলছে, ইতিহাস গড়ার জন্য মাত্র ৮৩ রান দূরে জম্মু-কাশ্মীর। হাতে এখনও আট উইকেট। প্রথমবার রনজি ফাইনালে ওঠার হাতছানি তাদের সামনে। যদিও ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা, শেষ দিনে নাটকীয় মোড় আসতেই পারে। কিন্তু ফলাফল যাই হোক, বাংলার পুরনো রোগ—নকআউট স্নায়ুচাপ—আবারও সামনে চলে এসেছে। প্রশ্ন একটাই, এই ব্যর্থতার চক্র থেকে বেরোবে কবে বাংলা?

