বিজয় হাজারেতে বাংলার পেস ব্যাটারি লিখল নতুন ইতিহাস, ১০ ওভারের আগেই ম্যাচ পকেটে অভিমন্যুদের !

একের পর এক ম্যাচে বাংলার দাপুটে পারফরম্যান্স যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে—ঘরোয়া ক্রিকেটেও গতি, আগ্রাসন আর নিখুঁত পরিকল্পনার মিশেলে কীভাবে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করা যায়। বিজয় হাজারে ট্রফির মঞ্চে রাজকোটে জম্মু ও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে বাংলার সাম্প্রতিক জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়, এটি ছিল আধিপত্যের স্পষ্ট ঘোষণা। বাংলার পেস ব্যাটারি যেভাবে আগুন ঝরিয়েছে, তাতে জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাটাররা রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তাদের ইনিংস গুটিয়ে যায় মাত্র ৬৩ রানে, যা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে কাশ্মীরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন স্কোর। যে স্কোর তাড়া করতে নেমে বাংলা ব্যাটিং লাইনআপ কোনও চাপই অনুভব করেনি, বরং ১০ ওভারের মধ্যেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়, যেন প্রতিপক্ষের বোলিংকেও একটি বার্তা দেওয়া—বাংলা শুধু বলেই নয়, ব্যাটেও সমান ভয়ঙ্কর।
এই ম্যাচে বাংলার বোলিং আক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ মহম্মদ শামি, যাঁর বলের গতি ও সুইং শুরু থেকেই বিপক্ষকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। তিনি ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন। তবে দিনের সেরা পারফরমার আকাশ দীপ ও মুকেশ কুমার। এই দুই তরুণ পেসার চারটি করে উইকেট নিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং অর্ডারকে কার্যত ধ্বংস করে দেন। তাঁদের বোলিংয়ে ছিল লাইন-লেংথের অনবদ্য নিয়ন্ত্রণ, সঙ্গে বাউন্স ও সিম মুভমেন্টের নিখুঁত ব্যবহার। বিপক্ষের অভিজ্ঞ ব্যাটার পরশ ডোগরা সর্বোচ্চ ১৯ রান করলেও, বাংলার বোলিংয়ের সামনে তিনিও স্বস্তিতে থাকতে পারেননি। শুধু শুভম খাজুরিয়া দুই অঙ্কে পৌঁছতে পেরেছিলেন, যা স্পষ্ট করে দেয় কাশ্মীরের ব্যাটিং লাইনআপে বাকিরা কতটা অসহায় ছিলেন।
২০.৪ ওভারে ৬৩ রানে অলআউট হওয়ার পরিসংখ্যানটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এর আগে কখনও এত কম রানে শেষ হয়নি জম্মু ও কাশ্মীরের ইনিংস। ২০১৫ সালে হরিয়ানার বিরুদ্ধে ২২ ওভারে ৭৫ রানে অলআউট হওয়াই ছিল আগের সর্বনিম্ন, কিন্তু এবার এক দশক পর সেই রেকর্ডও ভেঙে গেল। এটি শুধু একটি পরাজয় নয়, এটি ছিল মানসিক বিপর্যয়, যেখানে ভাবার সময়ও পায়নি বিপক্ষ।
বাংলার ব্যাটিংয়ে অবশ্য কোনও নাটক ছিল না, ছিল স্থিরতা ও আত্মবিশ্বাস। ওপেন করতে নেমে অভিষেক পোড়েল ২৬ বলে ৩০ রান করে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল আগ্রাসী স্ট্রোকপ্লে, দ্রুত রান তোলার ক্ষুধা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলাকে শেষ করে দেওয়ার দক্ষতা। অন্যদিকে সুদীপ কুমার ঘরামি ২৭ বলে ২৫ রান করেন, যা দলকে দ্রুত জয়ের দিকে এগিয়ে দেয়। অধিনায়ক অভিমন্যু ঈশ্বরণ ৪ রান করে আউট হলেও, দলের উপর তার কোনও প্রভাব পড়েনি। আইপিএলের নিলামে আলোচনায় থাকা পেসার আকিব নবি ২১ রান দিয়ে ১ উইকেট তুলে নেন, যা দেখায়—বাংলার বিরুদ্ধে উইকেট পাওয়াও এখন সহজ নয়।
এই ম্যাচেই বাংলার তরুণ স্পিনার রোহিতের অভিষেক হয়, যিনি অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে নজর কেড়েছেন। যদিও তাঁকে বল করার সুযোগ দিতে হয়নি, কারণ পেসাররাই ম্যাচের ভাগ্য ৩০ ওভারের আগেই লিখে ফেলেছিলেন। এটি বাংলার বোলিং গভীরতার আরেকটি প্রমাণ—দলে স্পিনার থাকলেও, গতি আক্রমণই প্রতিপক্ষকে শেষ করতে যথেষ্ট।
বিজয় হাজারে ট্রফিতে বাংলা এখনও পর্যন্ত চারটি ম্যাচ খেলেছে। একমাত্র হার বরোদার বিরুদ্ধে। শুরুতেই বিদর্ভকে হারিয়ে অভিযান শুরু, তারপর চণ্ডীগড় ও এখন জম্মু ও কাশ্মীর—দুই দলকেই উড়িয়ে দিয়েছে লক্ষ্মীরতন শুক্লর দল। বাংলার জয়রথ তাই শুধু এগোচ্ছে না, এটি প্রতিটি ম্যাচে আরও গতি পাচ্ছে। বিশেষ করে শামি-মুকেশ-আকাশদের বোলিং ফর্ম যে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাতে ট্রফির লড়াইয়ে বাংলা এবার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার। গতি, আগ্রাসন আর দলগত সমন্বয়ের এই মিশ্রণে বাংলা ক্রিকেট এখন প্রতিপক্ষের কাছে এক আতঙ্কের নাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 18 =