বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এখন কার্যত রাজনৈতিক চাপের ঘূর্ণিপাকে। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এবার তারা আইসিসি-কে চিঠি দিয়ে জানাতে চলেছে— ভারত থেকে ম্যাচ সরাতে হবে। নেপথ্যে রয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সরাসরি চাপ, যা বোর্ডের স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়ার বিতর্কে ইতিমধ্যেই দুই বোর্ডের সম্পর্ককে উত্তপ্ত করেছে। বিসিবি প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানালেও, বিসিসিআইয়ের মতো প্রভাবশালী সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বাস্তব ক্ষমতা তাদের নেই— সেটি নিজেই স্বীকার করেছেন বোর্ড সভাপতি আমিনুল হক বুলবুল। তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশ বোর্ডের অবস্থান আবেগনির্ভর হলেও বাস্তব রাজনীতির মাঠে তা দুর্বল।
শনিবার রাতে বিসিবির অভ্যন্তরীণ বৈঠকে একটি তুলনামূলক সংযত ও বাস্তবসম্মত অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। বোর্ড কর্তারা উপলব্ধি করেন, ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হতে আর মাত্র এক মাস বাকি— এই অল্প সময়ে ভেন্যু বদলের দাবি তোলা ‘অবাস্তব’ এবং ‘অপ্রয়োগযোগ্য’। তাঁরা এটিও বুঝেছিলেন যে, আইসিসির চেয়ার ভারতের জয় শাহ, যিনি আবার ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র। ফলে আইসিসিতে চিঠি দিলেও তা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল। তাই প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়— চিঠিতে শুধুমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে, ভেন্যু বদলের দাবি তোলা হবে না।
কিন্তু রবিবার সকালে দৃশ্য বদলে যায়। বিসিবি যে ভেন্যু বদলের দাবি তুলছে না— এই খবর সরকার পর্যন্ত পৌঁছতেই ‘আসরে নামে’ ইউনুস প্রশাসন। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে বোর্ড কর্তাদের সাফ বার্তা দেওয়া হয়— “শুধু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট নয়, ভারত থেকে ম্যাচ সরানোর দাবি জানাতেই হবে। এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।” কার্যত ‘কোনও বিকল্প নেই’ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে দেওয়া হয়। সরকারি চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, বোর্ড কর্মকর্তারা নিজেদের আপত্তি জানিয়েও শেষ পর্যন্ত ই-মেইলে ভেন্যু বদলের দাবি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
বোর্ডের অন্দরে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য আত্মঘাতী’ বলে মনে করছেন। কর্মকর্তারা সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা ও নীতিনির্ধারকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন— দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বর্জন বা ভেন্যু বদলের দাবি তুললে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সূচি, আর্থিক চুক্তি, এমনকি আইসিসির সঙ্গে সম্পর্কেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু সরকার নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকে।
রবিবার বিকেলে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেসবুকে যে মন্তব্য করেন, তা পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। তিনি জানান, “বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ।” তাঁর পোস্টে বিসিসিআইয়ের নীতিকে “উগ্র সাম্প্রদায়িক” আখ্যা দিয়ে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়। নজরুলের বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়— এটি বোর্ডের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং সরকারের চাপেই নেওয়া রাজনৈতিক অবস্থান।
সব মিলিয়ে, বোর্ড ও সরকারের সংঘাত এখন প্রকাশ্য। বিসিবি জানে— ভারত সফর বাতিল করলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ক্ষতি হতে পারে, তবু সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না স্বাধীনভাবে। অন্যদিকে সরকার ক্রিকেটকেও কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মাঠের বাইরের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এখন সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

