৪২১ বছরের ঐতিহ্য! লক্ষ্মীপুরের চৌধুরী বাড়িতে চতুর্ভুজা রূপে পূজিতা মা দুর্গা, জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক আধ্যাত্মিক বিশ্বাস

সুমন মণ্ডল,চন্দ্রকোনা : দুর্গাপুজো মানেই দেবী দুর্গার দশভুজা রূপ। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা ১ নম্বর ব্লকের লক্ষ্মীপুর গ্রামে চৌধুরী বাড়িতে দেবী পূজিতা হন চতুর্ভুজা রূপে। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই পুজো আজও বহন করে চলেছে প্রাচীন ঐতিহ্য, পারিবারিক বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য নিদর্শন।

কোনও প্রাচীন পুঁথি কিংবা শাস্ত্রনির্দেশিত নিয়মের ভিত্তিতে নয়, বরং এক পারিবারিক আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই এই বিশেষ রূপের আরাধনা হয়ে আসছে বলে জানা যায়। ঐতিহ্য মেনে দেবী এখানে একচালার। চৌধুরী বাড়ির এই পুজোয় মা দুর্গা শুধু অসুরদলনী যোদ্ধা নন, তিনি যেন পরিবারের সমস্ত সন্তানকে এক ছাদের তলায় আগলে রাখা এক চিরন্তন স্নেহময়ী জননী।

চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজোর সূচনা ঠিক কে করেছিলেন, তা আজও অজানা। তবে পরিবারের বর্তমান সদস্য বাপ্পাদিত্য চৌধুরীর কথায়, কল্যাণ চৌধুরী এই পরিবারের কালীপুজোর সূচনা করেছিলেন। কালীমূর্তির পায়ে আজও তাঁর নাম লেখা রয়েছে। তাঁর প্রপৌত্রের হাত ধরেই পরিবারের দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল বলে জানা যায়।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে মন্দিরের কাঠামো, কিন্তু বদলায়নি ঐতিহ্যের মূল সুর। প্রথমদিকে মাটির দেওয়াল ও খড়ের ছাউনি দেওয়া একটি সাধারণ মন্দিরেই পুজো হতো। পরে খড়ের ছাউনি সরিয়ে তৈরি হয় টিনের ছাউনি দেওয়া আটচালা নাটমন্দির। বর্তমানে সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে আধুনিক পাকা মন্দির। বাপ্পাদিত্য চৌধুরীর উদ্যোগে এমনভাবে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে নাটমন্দির ও মূল মন্দিরের অংশ একসূত্রে মিশে গিয়েছে। যেন উৎসবের দিনগুলিতে পরিবারের সকলকে এক ছাদের তলায় একত্রিত করারই প্রতীক এই মন্দির।

রথযাত্রার রেশ কাটতে না কাটতেই চৌধুরী বাড়িতে শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। উল্টোরথের দিন পুরোহিতের হাত ধরে প্রতিমার কাঠামোয় পড়ে মাটির প্রথম প্রলেপ। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে প্রতিমা নির্মাণের কাজ।

এই পুজোর অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য মহালয়ার ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে দেবীর ঘট স্থাপন। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গভীর আবেগ ও পারিবারিক স্মৃতি। দেবীর আগমন, শঙ্খধ্বনি ও ধূপের সুগন্ধে মুখরিত পরিবেশে যেন স্মরণ করা হয় পরিবারের প্রয়াত পূর্বপুরুষদেরও। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই প্রথা আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।

সময়ের সঙ্গে পুজোর কিছু আচার-অনুষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও মূল ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে। একসময় সন্ধিপুজো ও নবমীতে ছাগবলি দেওয়ার প্রথা ছিল। বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ হয়েছে। তার পরিবর্তে কুমড়ো, আখ কিংবা শসা দিয়ে প্রতীকী বলিদানের রীতি চালু হয়েছে। দশমীর বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিদিনের পুজো নির্দিষ্ট প্রাচীন রীতি মেনেই সম্পন্ন হয়।

চৌধুরী বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাসও। একসময় জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে আয়োজন করা হতো কাঙালি ভোজনের। পরবর্তীকালে শুরু হয় ফকির ভোজনের প্রথা। মুসলিম ফকিরেরা এই বাড়িতে এলে তাঁদের গুড় ও মুড়ি খাওয়ানো হতো। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই রীতি সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক সুন্দর দৃষ্টান্ত বহন করে চলেছে।

আজ সময়ের পরিবর্তনে পুজোর বাহ্যিক আয়োজন ও কিছু প্রথায় বদল এসেছে। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের চৌধুরী বাড়ির চতুর্ভুজা দুর্গাপুজোর চার শতাব্দীরও বেশি সময়ের ভক্তি, বিশ্বাস ও আবেগ আজও অমলিন। ঐতিহ্যের পরম্পরা বুকে নিয়ে এই পুজো শুধু একটি পরিবারের আরাধনা নয়, বরং এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক জীবন্ত নিদর্শন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − 12 =