আরজি কর কাণ্ড: সেমিনার রুম ভাঙার নির্দেশ প্রমাণিত হলে স্বাস্থ্য সচিবকে পদ থেকে সরানোর কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

কলকাতা : আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল মামলার তদন্তে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম যদি অপরাধস্থল অর্থাৎ সেমিনার রুম ভেঙে ফেলার বা প্রমাণ নষ্ট করার কোনো নির্দেশ দিয়ে থাকেন, তবে তাঁকে অবিলম্বে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা হবে।

শুক্রবার কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আয়োজিত নবম ‘মেডিভিশন ন্যাশনাল কনভেনশন’-এর মঞ্চে এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই মঞ্চেই আরজি করের নির্যাতিতার মা এবং পানিহাটির বিধায়ক রত্না দেবনাথ সরাসরি স্বাস্থ্য সচিবের বিরুদ্ধে প্রমাণ লোপাট এবং ব্যাপক দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ তোলেন। এই খোলা ফোরামে ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষোভ ও অভিযোগ শোনার পরেই মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রত্না দেবনাথ প্রশ্ন তোলেন, কার নির্দেশে এবং কী উদ্দেশ্যে সেই সেমিনার রুম ও সংলগ্ন শৌচাগার— যেখানে তাঁর মেয়েকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল— রাতারাতি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে সংস্কার করা হয়েছিল? তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, এত বড় অপরাধের পিছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত স্বাস্থ্য সচিব এখনও কীভাবে তাঁর পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন? এই ধরনের আধিকারিকেরা পদে থাকলে সাধারণ মানুষ কীভাবে ন্যায়বিচার পাবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। একমাত্র মেয়ের বিচারই রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রত্না দেবনাথের উত্থাপিত এই অভিযোগগুলিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন যে অভিযোগগুলি যথেষ্ট গুরুতর। তিনি অনুষ্ঠানেই জানান, তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব ওই ঘটনাস্থল ভেঙে ফেলার বা প্রমাণ মুছে ফেলার কোনো নির্দেশ আদৌ দিয়েছিলেন কি না, তা তিনি নিজে নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছেন।

এর পাশাপাশি, এই ঘটনায় রাজ্য পূর্ত দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও কঠোর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ঘরটি ভেঙে ফেলার প্রশাসনিক নির্দেশ যেখান থেকেই আসুক না কেন, মাঠ পর্যায়ে তার সংস্কার ও ভাঙার কাজ সরাসরি পিডব্লিউডি-র তত্ত্বাবধানেই করা হয়েছিল। ফলে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত পিডব্লিউডি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অন্যান্য আধিকারিকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করা হবে। তদন্তে গাফিলতি বা অপরাধমূলক সহযোগিতার প্রমাণ মিললে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।

এদিনের সম্মেলন মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাজ্য সরকার শুরু থেকেই নির্যাতিতার পরিবারের পাশে রয়েছে এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ঘটনার পাঁচ দিন পর হাসপাতালে যে পরিকল্পিত ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল, তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তৎকালীন শাসকদলের এক বিধায়ক পুলিশের প্রত্যক্ষ সহায়তায় একটি নির্দিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন, যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল সমস্ত তথ্য-প্রমাণ চিরতরে মুছে ফেলা। পাশাপাশি, এই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত অতীতে ঘটে যাওয়া অন্যান্য দুর্নীতির মামলাগুলিও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে কঠোর হুশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 3 =