মুলানপুরের মাঠে দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ হতেই যেন স্পষ্ট হয়ে গেল ম্যাচের চিত্রনাট্য। ভারতের রানের পাহাড় আর বোলারদের আগ্রাসনের সামনে ক্রমশ দিশাহারা আফগানিস্তান। একদিকে ভারতীয় ব্যাটারদের রেকর্ড গড়া ইনিংস, অন্যদিকে অভিষেক ম্যাচে তরুণ স্পিনার মানব সুথারের জাদু— সব মিলিয়ে দ্বিতীয় দিনের শেষে জয়ের সুবাস পাচ্ছে টিম ইন্ডিয়া।
দিনের শুরুতেই ভারত তাদের প্রথম ইনিংসকে বিশাল উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। অধিনায়ক শুভমান গিল আগের দিনের ইনিংসকে আরও বড় করে ১২৬ রানে শেষ করেন। তাঁর আউট হওয়ার পরও রানের গতি থামেনি। ঋষভ পন্থ নিজের স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণাত্মক মেজাজে আফগান বোলারদের উপর চাপ তৈরি করেন। শতরানের খুব কাছে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত ৮১ রানে থামতে হয় তাঁকে। তবে ভারতের ইনিংসের শেষদিকে মূল্যবান অবদান রাখেন ওয়াশিংটন সুন্দর ও মানব সুথার। সুন্দরের অর্ধশতরান এবং মানবের দায়িত্বশীল ২৮ রান ভারতের স্কোরকে ৫৬৪ রানে পৌঁছে দেয়। এরপর ইনিংস ঘোষণা করে ভারত।
এত বড় স্কোরের জবাব দিতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় আফগানিস্তান। ভারতীয় পেসার ও স্পিনাররা এমন নিখুঁত পরিকল্পনায় আক্রমণ শানান যে আফগান ব্যাটারদের এক মুহূর্তও স্বস্তি মেলেনি। প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ নতুন বলে ধারাবাহিকভাবে সঠিক জায়গায় বল ফেলে দ্রুত দুই উইকেট তুলে নেন। অন্য প্রান্ত থেকে চাপ বাড়াতে থাকেন বাকি বোলাররাও।
তবে দিনের আসল আকর্ষণ ছিলেন মানব সুথার। সীমান্তঘেঁষা রাজস্থানের এক ছোট শহর থেকে উঠে আসা এই তরুণ দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখেছিলেন ভারতের সাদা জার্সি গায়ে চাপানোর। সেই স্বপ্নপূরণের দিনে তিনি শুধু মাঠে নামেননি, নিজের সামর্থ্যেরও প্রমাণ দিয়েছেন। বল হাতে আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল এবং ধারাবাহিক— ঠিক যেমনটা একজন টেস্ট বোলারের হওয়া প্রয়োজন।
মানবের ক্রিকেটযাত্রাও কম সংগ্রামের নয়। আইপিএলে দলে থেকেও ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি। ভারত ‘এ’ দলের হয়ে সফরে গিয়েও একাদশে জায়গা হয়নি। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। কঠোর পরিশ্রম আর অপেক্ষার পর অবশেষে জাতীয় দলের দরজা খুলেছে তাঁর জন্য। আর সেই সুযোগ পেয়েই নিজের উপস্থিতি জোরালোভাবে জানান দিয়েছেন।
ম্যাচ শেষে মানব জানান, বল ঘোরানোর ক্ষমতাই তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সেই শক্তিকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। একই জায়গায় ধারাবাহিকভাবে বল ফেলে ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা। ভারতের হয়ে খেলার স্বপ্ন যে অবশেষে সত্যি হয়েছে, সেই আবেগও লুকিয়ে রাখেননি তরুণ স্পিনার।
অধিনায়ক শুভমান গিলের প্রশংসাও করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলার সুবাদে গিল তাঁর শক্তি ও দুর্বলতা ভালোভাবেই জানেন। মাঠে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন ভারত অধিনায়ক।
আফগানিস্তানের হয়ে রহমত শাহ কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর লড়াই কতক্ষণ স্থায়ী হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। দ্বিতীয় দিনের শেষে ৫ উইকেটে ১১৩ রান করে আফগানরা এখনও ভারতের বিশাল স্কোর থেকে অনেক দূরে। ফলে ম্যাচ বাঁচানো তো দূরের কথা, ফলো-অন এড়াতেই তাদের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।
দুই দিনের খেলা শেষে ছবিটা পরিষ্কার— ভারত এখন চালকের আসনে নয়, কার্যত স্টিয়ারিং পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে ফেলেছে। ব্যাটে, বলে এবং আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে থাকা ভারত তৃতীয় দিনে কত দ্রুত আফগানিস্তানকে চাপে ফেলতে পারে, সেটাই এখন দেখার। আর সেই গল্পের নতুন নায়ক হয়ে উঠেছেন মানব সুথার— সীমান্তের ছোট শহর থেকে উঠে এসে যিনি অভিষেক মঞ্চেই আলো কেড়ে নিয়েছেন।

