ভারতে বিশ্বকাপ সম্প্রচারে অনিশ্চয়তার ছায়া !

আর মাত্র দু মাসের অপেক্ষা ।  তারপরেই শুরু হতে চলেছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরকে ঘিরে চার বছর ধরে অপেক্ষা করেন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী। কিন্তু এবার সেই আনন্দের আগেই ভারতের দর্শকদের মনে তৈরি হয়েছে বড় এক অনিশ্চয়তা—তারা আদৌ কি টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বকাপ দেখতে পারবেন?
এই প্রশ্ন এখন শুধু একটি সম্প্রচার সংক্রান্ত বিষয় নয়, বরং ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর আবেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। এতদিন যেটা ছিল ঘরের উৎসব—পরিবার, বন্ধু ও পাড়ার আড্ডায় রাত জেগে ম্যাচ দেখা—সেটাই এবার অনিশ্চয়তার মুখে। কারণ এখনও পর্যন্ত ভারতে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য কোনও নির্দিষ্ট সংস্থা চূড়ান্ত হয়নি। ফিফা বহু চেষ্টা করেও সম্প্রচারের স্বত্ব বিক্রি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
শুরুর দিকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা কমিয়ে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলারে নামানো হলেও বড় কোনও মিডিয়া সংস্থা আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি জিওহটস্টারের পক্ষ থেকে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
এই অনীহার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোর আর্থিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি। এর সঙ্গে আরও বড় একটি বিষয় হলো ভারতের বাজারে ক্রিকেটের আধিপত্য। ক্রিকেট এখানে শুধু খেলা নয়, এক আবেগ। গত কয়েক বছরে ক্রিকেট সম্প্রচারের স্বত্ব কিনতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে বিভিন্ন সংস্থা। ফলে ফুটবলের জন্য এত বড় আর্থিক ঝুঁকি নিতে অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন হচ্ছে ইউনাইটেড স্টেটস, কানাডা এবং মেক্সিকোতে। এই তিন দেশের সময় ভারতের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। ফলে বেশিরভাগ ম্যাচই হবে ভারতীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাত বা ভোরে। স্বাভাবিকভাবেই এই সময় দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কম দর্শক মানে কম বিজ্ঞাপন—আর কম বিজ্ঞাপন মানেই সম্প্রচার সংস্থার জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি।
তবে এই সব হিসাব-নিকাশের বাইরে রয়েছে এক বিশাল আবেগ। সেই তরুণ, যে প্রিয় দলের জার্সি পরে টিভির সামনে বসে থাকে; সেই বন্ধুরা, যারা রাত জেগে গোল হলে একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে; কিংবা সেই পরিবার, যারা একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপের উত্তেজনায় ডুবে যায়—তাদের কাছে এটি শুধুই খেলা নয়, এক অনুভূতি।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় ভারতেও ফুটবলের উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো ছিল। রাস্তায় পতাকা, ঘরে ঘরে আলোচনা—মেসি না এমবাপে—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগেই যেন অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে।
বিশ্বায়নের এই যুগে দাঁড়িয়ে যদি কোটি কোটি দর্শক নিজেদের প্রিয় খেলা দেখতে না পান, তা হলে সেটা শুধু বাজারের ব্যর্থতা নয়, বরং এক বড় আবেগের পরাজয়ও বটে। এখন সকলের নজর শেষ মুহূর্তে কোনো সম্প্রচার সংস্থা এগিয়ে আসে কি না তার দিকে ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − 5 =