প্রবীণ মহিলা বাগান সমর্থকের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ময়দান, সবুজ-মেরুন ভালোবাসা রইল অমলিন স্মৃতিতে

চলে গেলেন ‘মোহনবাগান দিদা’, গ্যালারিতে থেমে গেল এক অনন্ত আবেগ

কলকাতা : বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছিল অনেক আগেই, কিন্তু প্রাণের ক্লাব গোল করলেই যে মানুষটির মুখে ফুটে উঠত শিশুসুলভ হাসি—সেই ‘মোহনবাগান দিদা’ শান্তি চক্রবর্তী আর নেই। শুক্রবার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। শনিবার দুপুরে তাঁর নিথর দেহ যখন শেষবারের মতো আনা হল মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুতে, তখন আবেগে ভেসে গেল গোটা ময়দান। শক্তপোক্ত ফুটবলার থেকে শুরু করে অভিজ্ঞ কর্তারাও চোখের জল লুকোতে পারেননি। শান্তি চক্রবর্তীর এই অমলিন ভালোবাসার শুরু কয়েক দশক আগে। তখন গ্যালারিতে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। রেডিওর সামনে বসেই তিনি শুনতেন শ্যাম থাপার খেলার ধারাভাষ্য। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু তাঁর ভালোবাসা বদলায়নি একটুও। মধ্য কলকাতার অক্রুর দত্ত লেনের ছোট্ট, ভাঙাচোরা ঘরে কাটত তাঁর জীবন।

অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মোহনবাগান ক্লাবের দেওয়া একটি উত্তরীয়। সেই উত্তরীয় যেন তাঁর কাছে ছিল অমূল্য ধন, তাঁর অস্তিত্বের প্রতীক। ৮৫ বছর বয়সেও মাঠে গিয়ে খেলা দেখা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। গ্যালারিতে মহিলাদের সংখ্যা যখন হাতে গোনা, তখনই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনুপ্রেরণা। ২০১৫ সালে ‘লেডি মেরিনার্স’ গড়ে ওঠার পিছনেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন এক জীবন্ত সেতুবন্ধন।

মোহনবাগানের প্রতি তাঁর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে ক্লাব তাঁকে ‘উমাকান্ত পালোধি সেরা সমর্থক’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। ময়দানের ভিড়ে তিনি শুধু একজন সমর্থক নন—ছিলেন এক ইতিহাস, এক আবেগ। শেষ কয়েকদিন শারীরিক অসুস্থতায় হাসপাতালে লড়াই চালিয়েছিলেন তিনি। শুক্রবার সেই লড়াই থেমে যায়। শনিবার তাঁর প্রিয় ক্লাব তাঁবুতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন ফুটবলার, কর্তাব্যক্তি ও অসংখ্য সমর্থক।

আজ তিনি নেই। কিন্তু গ্যালারির প্রতিটি স্লোগানে, প্রতিটি উল্লাসে, প্রতিটি সবুজ-মেরুন পতাকার দোলায় যেন বেঁচে থাকবেন ‘মোহনবাগান দিদা’। কারণ ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না—তা শুধু রয়ে যায় স্মৃতির গভীরে, চিরকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − ten =