কল্যাণীর ঘরের মাঠে সব কিছুই যেন বাংলার পক্ষেই ছিল। গ্রুপ পর্বে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট সংগ্রহ, কোয়ার্টার ফাইনালে ইনিংসে জয়—সব মিলিয়ে আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছিল দল। দেখে মনে হচ্ছিল, এ বার আর কেউ আটকাতে পারবে না বাংলাকে। কিন্তু ক্রিকেট এমনই খেলা, যেখানে একটি খারাপ সেশন পুরো মরসুমের পরিশ্রমে জল ঢেলে দিতে পারে। ঠিক সেটাই হল রঞ্জি ট্রফির সেমিফাইনালে। বাংলা ক্রিকেট দল হেরে বিদায় নিল, আর ইতিহাস গড়ে প্রথমবার ফাইনালে উঠল জম্মু-কাশ্মীর ক্রিকেট দল।
শেষ দিনের সকালে জম্মু-কাশ্মীরের জয়ের জন্য দরকার ছিল মাত্র ৮৩ রান, হাতে ছিল ৮ উইকেট। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছিল ম্যাচ কার্যত হাতছাড়া। তবু ক্রিকেটে শেষ বল পর্যন্ত আশা থাকে। দিনের শুরুতেই আকাশদীপ দুই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে সেই আশার সঞ্চার করেছিলেন। এক সময় মনে হচ্ছিল, যদি আরও একটি-দুটি দ্রুত উইকেট পাওয়া যায়, তবে ম্যাচে ফিরে আসা অসম্ভব নয়। কিন্তু বাংলার বোলাররা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেন না। বংশরাজ শর্মা ও আব্দুল সামাদ দৃঢ়তা দেখালেন। বংশরাজ ৪৩ ও সামাদ ৩০ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। বাংলার হতাশা তখন স্পষ্ট।
ম্যাচের মোড় ঘুরেছিল আসলে দ্বিতীয় ইনিংসেই। প্রথম ইনিংসে সুদীপ ঘরামির শতরানের সৌজন্যে বাংলা তোলে ৩২৮ রান। জবাবে জম্মু-কাশ্মীর করে ৩০২। মহম্মদ শামি একাই ৮ উইকেট নিয়ে দলকে ২৬ রানের লিড এনে দেন। সেই মুহূর্তে ম্যাচ পুরোপুরি বাংলার নিয়ন্ত্রণে ছিল। মনে হচ্ছিল, আরেকটি ভালো ব্যাটিং পারফরম্যান্সই ফাইনালের দরজা খুলে দেবে।
কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে নামতেই যেন ভেঙে পড়ে ব্যাটিং লাইনআপ। শুরু থেকেই পর পর উইকেট হারাতে থাকে বাংলা। অভিমন্যু ঈশ্বরণ ৫, সুদীপ চট্টোপাধ্যায় ০, সুদীপ ঘরামি ০, অনুষ্টুপ মজুমদার ১২, সুরজ সিন্ধু জয়সওয়াল ১৪, সুমন্ত গুপ্ত ৮, হাবিব গান্ধীরা ১০—কেউই দায়িত্ব নিতে পারলেন না। চেনা পিচ, ঘরের মাঠ, পরিচিত পরিবেশ—কোনও কিছুই কাজে এল না। মাত্র ৯৯ রানে গুটিয়ে যায় গোটা দল। এক সেশনের এই ধসই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
কঠিন পরিস্থিতিতে কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন শাহবাজ আহমেদ। তাঁর ২৪ রান সামান্য প্রতিরোধ গড়েছিল বটে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত ছিল না। জম্মু-কাশ্মীরের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১২৬ রান। প্রথম ইনিংসে শামির আগুনে বোলিং দেখা গেলেও দ্বিতীয় ইনিংসে সেই ধার বজায় থাকল না। ৪ উইকেট হারালেও আত্মবিশ্বাস হারায়নি জম্মু-কাশ্মীর। ধীরে-সুস্থে রান তাড়া করে তারা পৌঁছে যায় ইতিহাসের দোরগোড়ায়।
প্রথমবার রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে ওঠার পর জম্মু-কাশ্মীরের ক্রিকেটারদের উল্লাস ছিল দেখার মতো। পারশ ডোগরার নেতৃত্বে এই দল গত কয়েক মরসুমে স্বপ্নের মতো উত্থান ঘটিয়েছে। সারা বছর নিয়মিত ক্লাব ক্রিকেটের সুযোগ না থাকলেও, বিভিন্ন রাজ্যে খেলে নিজেদের গড়ে তুলেছেন ক্রিকেটাররা। সেই সংগ্রামের ফল মিলল বড় মঞ্চে।
অন্যদিকে বাংলার জন্য এই হার নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। এত সুন্দরভাবে শুরু করা মরসুম এমনভাবে শেষ হবে, তা কেউ ভাবেনি। তবু ক্রিকেটের শিক্ষা এখানেই—একটি সেশন, একটি ভুল, একটি মুহূর্তই সব হিসাব পাল্টে দিতে পারে। বাংলা হয়তো এই হারের যন্ত্রণা বয়ে নিয়ে চলবে কিছু দিন, কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আবার আসবে। আর জম্মু-কাশ্মীরের জন্য শুরু হল এক নতুন অধ্যায়—স্বপ্নপূরণের পথে আর এক ধাপ এগোনোর গল্প।

