কলকাতা : দক্ষিণ কলকাতার আনন্দপুর থানা এলাকার নাজিরাবাদে একটি ডেকরেটরের গুদাম এবং নামী মোমো কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টা পরেও পরিস্থিতি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে মোট ১১টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতদেহগুলির অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে সেগুলি শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। অধিকাংশ জায়গায় ছাইয়ের স্তূপের নিচে থেকে কেবল পুড়ে যাওয়া হাড় ও কঙ্কাল উদ্ধার হচ্ছে। রাজ্য সরকার এই দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেছে।
স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, রবিবার রাতে ডেকোরেটর সংস্থার প্রায় ৩০ জন কর্মচারী গুদামের ভেতরে পিকনিক করছিলেন। কাঠ ও প্লাইউড জ্বালিয়ে সেখানে রান্না করা হয়েছিল এবং এরপর সবাই ওই চত্বরের ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গুদাম এবং মোমো কারখানার প্রধান দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগানো ছিল। রাত প্রায় আড়াইটে নাগাদ হঠাৎ আগুন লেগে যায়। দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে বিষাক্ত গ্যাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভেতরে থাকা লোকজন বাইরে বেরোনোর কোনও সুযোগ পাননি।
ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। নরেন্দ্রপুর থানায় এপর্যন্ত ১৩ জনের নিখোঁজ হওয়ার ডায়েরি করা হয়েছে, যদিও প্রায় ২০টি পরিবার দাবি করেছে যে তাদের স্বজনরা এখনও নিখোঁজ। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অধিকাংশ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এগরা, কাঁথি এবং হলদিয়া এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
বারুইপুর পুলিশ জেলার সুপার শুভেন্দ্র কুমার জানিয়েছেন যে, মৃতদেহগুলি শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষাই একমাত্র পথ।
রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু, সাংসদ সায়নী ঘোষ এবং বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্দা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু বলেন, প্রায় ৩৫ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই চত্বরে অগ্নিনির্বাপণের কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। তিনি ফায়ার সেফটি অডিট এবং বৈধ অনুমতির বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ডেকরেটর সংস্থার মালিক গঙ্গাধর দাস দাবি করেছেন যে, আগুন পাশের মোমো কারখানা থেকে ছড়িয়েছে| অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধভাবে কোল্ড ড্রিঙ্কস তৈরির কাজ চলত। পুলিশ গঙ্গাধর দাসকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
জানা গেছে যে, রবিবার রাতে আগুন লাগার পর দমকলের ১২টি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হয়। ঘন জনবসতি এবং সরু রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজে অনেক দেরি হয়। বর্তমানে পুলিশ পুরো এলাকাটি ঘিরে সিল করে দিয়েছে এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দল ধ্বংসস্তূপ থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছে। উদ্ধার হওয়া দেহাংশের সঙ্গে নিখোঁজদের তালিকার মিল খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে প্রশাসন, যাতে শনাক্তকরণ করে পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়া যায়।

