দু’বছর ধরে আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি না বাড়া এবং মাঠে স্ট্যান্ড-বাই আম্পায়ার তুলে দেওয়ার প্রস্তাব—দুটি ঘটনাই এখন বাংলার ক্রিকেট মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল (সিএবি)–এর সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিয়ে আম্পায়ার, ক্রিকেটপ্রেমী, এমনকি ময়দানের অভিজ্ঞ মহল—সকলের মধ্যেই অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে। কারণ, এই বিষয়গুলো সরাসরি স্থানীয় ক্রিকেটের মান, নিরপেক্ষতা এবং পেশাদার কাঠামোকে আঘাত করছে। প্রথমত, ম্যাচ ফি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়া।
এর আগে বৈঠকে ঠিক হয়েছিল, আম্পায়ারদের ম্যাচ ফি প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ানো হবে। কিন্তু গত দু’বছর ধরে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। এর ফলে আম্পায়ারদের মধ্যে ক্ষোভ জমা হয়েছে। গ্রেড-ওয়ান আম্পায়াররা সুপার ডিভিশনের ম্যাচ পরিচালনা করলে প্রতি দিন ৩০০০ টাকা পান। ‘এ’ গ্রেডের আম্পায়াররা প্রথম ডিভিশনের ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচ পরিচালনায় ২৪২০ টাকা পান। গ্রেড-টু আম্পায়াররা পান ১৮০০ টাকা। ‘সি’ ও ‘ডি’ গ্রুপের ক্ষেত্রে ফি যথাক্রমে ১২০০ ও ১১০০ টাকা। এই পারিশ্রমিক বর্তমান সময়ের বাজারদর, যাতায়াত খরচ, প্রস্তুতি, দায়িত্ব ও চাপের তুলনায় অত্যন্ত কম—বিশেষত যখন ফি বৃদ্ধিও বন্ধ। ফলে দক্ষ আম্পায়ারদের অনেকেই আগ্রহ হারাচ্ছেন, কেউ কেউ মাঠের দায়িত্ব নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন, আবার অনেকে ম্যাচ করাই বন্ধ করে দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি স্থানীয় ক্রিকেটে যোগ্য আম্পায়ারের ঘাটতি আরও প্রকট করছে, যা খেলার মানের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
দ্বিতীয়ত, স্ট্যান্ড-বাই আম্পায়ার তুলে দেওয়ার ভাবনা। সিএবি যুগ্ম সচিব মদনমোহন ঘোষ নাকি খরচ বাঁচানোর যুক্তিতে স্ট্যান্ড-বাই আম্পায়ার না রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এখন কোনও ম্যাচেই স্ট্যান্ড-বাই আম্পায়ারের প্রয়োজন পড়ছে না, তাই তাঁদের রেখে ‘লাভ’ নেই। কিন্তু এই যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল ও অদূরদর্শী। স্ট্যান্ড-বাই আম্পায়ার রাখা হয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য—যদি ফিল্ড আম্পায়ার অসুস্থ হন, আহত হন, বা ম্যাচ চলাকালীন কোনও সমস্যায় পড়েন, তখন বিকল্প হিসেবে সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নিতে পারেন। এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে শুরু করে পেশাদার ঘরোয়া কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্ট্যান্ড-বাই না থাকলে সমস্যা হলে নতুন আম্পায়ার পাঠাতে সময় লাগবে। ততক্ষণ ব্যাটিং দলের কাউকে লেগ-আম্পায়ারের দায়িত্ব দিতে হবে—যা সম্পূর্ণ
অপেশাদার এবং নিরপেক্ষতার পরিপন্থী। ক্রিকেটে নিরপেক্ষতা শুধু নিয়মের শর্ত নয়, এটি খেলার আত্মা। সেখানে ‘খরচ বাঁচানো’র নামে এই নিরপেক্ষতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা মানে খেলার মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে আপস করা।
আরও উদ্বেগজনক হল, সিএবির অনেক আম্পায়ার সরকারি চাকরিতে যুক্ত। সামান্য ম্যাচ ফি–র জন্য অফিস থেকে ছুটি নেওয়ায় তাঁদের আগ্রহ কম। ফলে
পেশাদার আম্পায়ারিংকে চাকরিজীবীদের ‘সাইড-ইনকাম’–এর মতো করে দেখা হচ্ছে, যা বাংলার ক্রিকেট কাঠামোর দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। প্রশ্ন উঠছে, সিএবি কি সত্যিই ক্রিকেট উন্নয়নের জন্য কাজ করছে, নাকি শুধু প্রশাসনিক খরচ-বাঁচানোর অঙ্কে মেতে উঠেছে?
বাংলার ক্রিকেট ইতিহাস গৌরবময়। ইডেনের উন্মাদনা, রঞ্জির ঐতিহ্য, লিগ ক্রিকেটের প্রাণচাঞ্চল্য—এসবই বাংলার ক্রীড়াসত্তাকে সংজ্ঞায়িত করে। সেখানে আম্পায়ারদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও মাঠের নিরপেক্ষ কাঠামো নিশ্চিত করা কোনও ‘বিলাসিতা’ নয়—এটি প্রয়োজন। খরচ কমানোর অনেক বিকল্প পথ থাকতে পারে—লজিস্টিক অপ্টিমাইজেশন, স্পনসরশিপ বৃদ্ধি, ডিজিটাল ম্যাচ-ম্যানেজমেন্ট, প্রশাসনিক ব্যয় পুনর্বিন্যাস—কিন্তু ক্রিকেটের সঙ্গে আপস করে নয়।
অতএব, ম্যাচ ফি না বাড়ানো ও স্ট্যান্ড-বাই তুলে দেওয়ার ভাবনা—দুটি সিদ্ধান্তই বাংলার ক্রিকেটের ভিতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। সিএবি যদি দ্রুত এই ভুল সংশোধন না করে, তবে স্থানীয় ক্রিকেট আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্রিকেট মানে শুধু ব্যাট-বলের লড়াই নয়, এটি পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও সম্মানের সমন্বয়। সেই সম্মান রক্ষা করা সিএবি-র দায়িত্ব, আর তা না পারলে সমালোচনা নয়—ইতিহাসই এর বিচার করবে।

