বোর্ডের নির্দেশ মেনে ঘরোয়া ক্রিকেটে নামা—একদিকে বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে ফর্ম ও ফিটনেস প্রমাণের মঞ্চ। কিন্তু বিজয় হাজারে ট্রফির মাঠেই রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলি দেখিয়ে দিলেন, তাঁদের ক্লাস চিরকালীন; প্রমাণের অধ্যায় তাঁদের ক্যারিয়ারে বহু আগেই লেখা হয়ে গিয়েছে। তবুও নিয়ম রক্ষার মঞ্চে দাঁড়িয়েও দুই মহাতারকা নিজেদের মতো করেই ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখলেন—দু’জনেই সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে, রোহিত আবার দেড়শোর গণ্ডি পেরিয়ে।
রোহিত শর্মার ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তনটা ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার।
প্রায় সাত বছর পর মুম্বইয়ের জার্সিতে নামা—নিজেই যেন একটা হেডলাইন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি, অধিনায়কত্বের চাপ, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ভিড়—এসব সামলে ইদানীং জাতীয় দলের তারকাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে দেখা বিরল। কিন্তু বিসিসিআইয়ের কড়া নির্দেশ ছিল—ওয়ানডে দলে জায়গা ধরে রাখতে হলে রান ও ফিটনেসে জবাব দিতে হবে। তাই প্রতিপক্ষ সিকিমের মতো তুলনায় দুর্বল দল হলেও, রোহিতকে মাঠে নামতেই হয়েছিল। তবে প্রতিপক্ষের নাম কাগজে যতই ছোট হোক, রোহিতের ব্যাটে তা কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। ৯৪ বলে ১৫৫ রানের ঝোড়ো ইনিংস, ৬২ বলে সেঞ্চুরি, ৯টি ছক্কা ও ১৮টি বাউন্ডারি—পরিসংখ্যান নয়, যেন বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের কবিতা। সিকিমের বোলাররা রোহিতের সামনে ছিলেন নেহাতই দর্শক; আর জয়পুরের সওয়াই মানসিংহ স্টেডিয়ামে উপস্থিত ১২ হাজার দর্শক ছিলেন সেই ব্যাটিং-ঝড়ের উচ্ছ্বসিত সাক্ষী। মুম্বই ৮ উইকেটে ম্যাচ জিতে নেয় অনায়াসে, কিন্তু দিনের আসল জয় ছিল দর্শকের আবেগের—রোহিতের টানেই মাঠ ভরেছিল, আর তাঁরা ফিরলেন পূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে।
অন্যদিকে বিরাট কোহলির মাইলফলক ছিল ঐতিহাসিক। অন্ধ্রপ্রদেশের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে প্রথম শটেই তিনি স্পর্শ করলেন লিস্ট এ ক্রিকেটে ১৬ হাজার রানের গণ্ডি—শচীন তেণ্ডুলকরের পর দ্বিতীয় ভারতীয় হিসেবে এই বিরল কীর্তি। শচীন যেখানে ৩৮৫ ইনিংসে ১৬ হাজার রান করেছিলেন, বিরাট তা করলেন মাত্র ৩৩০ ইনিংসে—যা তাঁর ধারাবাহিকতা, ফিটনেস ও মানসিক দৃঢ়তার অনন্য নিদর্শন। এরপর সেই ইনিংসেই এল অনবদ্য শতরান—চাপের মুখে নয়, বরং নিজের ব্যাটিং-দর্শনকে আবারও প্রতিষ্ঠা করার স্বাক্ষর হিসেবে। বিশ্বের সেরা বোলাররা যাঁর নাম শুনলেই পরিকল্পনা বদলান, সেখানে ঘরোয়া সার্কিটের অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ বোলিং আক্রমণ তাঁকে আটকাবে—এমনটা ভাবাই কঠিন। বিরাট সেটাই প্রমাণ করলেন, তবে তা অহংকারে নয়—নিজস্ব শ্রেষ্ঠত্বের সহজ, নিঃশব্দ ঘোষণা হিসেবে।
এই পারফরম্যান্সের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের বর্তমান মানের প্রেক্ষিতে, নিচের সারির দলগুলির বিরুদ্ধে বিরাট-রোহিতদের মতো বিশ্বমানের ব্যাটারদের খেলানো কতটা যুক্তিযুক্ত? ক্রিকেটীয় বিচারে হয়তো প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, তরুণ বোলারদের জন্য কাজটা পাহাড়প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অন্যদিকটাও ভাবতে হবে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজের আগে এই ম্যাচগুলি তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় অনুশীলন, ম্যাচ-ফিট থাকার সুযোগ, আত্মবিশ্বাসকে শাণিত রাখার মঞ্চ। আন্তর্জাতিক ম্যাচের মতো তীব্র চাপ না থাকলেও, প্রতিটি সেঞ্চুরি ও বড় ইনিংস তাঁদের প্রস্তুতির বার্তাকে স্পষ্ট করে—ফর্ম ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু ক্লাস চিরস্থায়ী। আর সেটাই রোহিত ও বিরাট আবারও লিখে দিলেন ।

